ইসলামে জিহাদ কি এবং এর লক্ষ্য কি

‘জিহাদ’ আরবী শব্দ, এর আভিধানিক অর্থ হল- রণক্ষেত্রে কিংবা যুদ্ধে পূরাণাঙ্গ শক্তি ঢেলে দেয়া।  ইসলা,নে দৃষ্টিতে জিহাদ হলো ইসলামের সাহায্য ও আল্লাহর দ্বীনকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নিবেদিত যুদ্ধ। (তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম, মাওলানা তকী উসমানী, ৩য় খন্ড, ৩য় পৃ.)   ইসলামের ঝান্ডা সমুন্নত করা ও রাখার লক্ষ্যে নিবেদিত এই জঙ্গ-জিহাদের মর্যাদা ইসলামে অরিসীম।এ পথে যারা জীবন বিলায় ইসলামের ভাষায় তারা অমর, বেহেশতের দরোজা তাদের জন্য সদা উন্মুক্ত।

 জিহাদের লক্ষ্য হলো, ইসলামের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, আল্লাহ‘র দ্বীনের বিজয় বিধান ও কুফরী শক্তিসমূহের পতন সাধন।  আর এটাই জিহাদের মূল লক্ষ্য।

পশ্চিমা উহুদী-কৃষ্টানরা উসলামের যে কোন বিধানকে বিকৃতভাবে উপস্হাপনে সদাসংকল্পবদ্ধ  এবং তৎপর। তাদের পটুতা ও দক্ষতারও কোন জুড়ি নেই। উসলামের বিমল-স্বচ্ছ-স্ফটিক ধারা ঘোলারঊপে উপস্হাপন অত:পর বক্রমনে মৎস শিকারে তাদের উপমা তারাই। তাদের এই মজ্জাগত স্বভাবমতেই ইসলামের অন্যান্য বিধানের মত পবিত্র জিহাদকেও কলুষিত  করতে কার্পণ্য করেনি তারা।  বরং পৃথিবীময় ঢাক-ঢেল পিটিয়ে প্রচার করেছে “ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করেছে তলোয়ারের জোরে”। এ ছিল প্রাচীনকালের ইহুদী থিউরি।  সেই একই থিউরির নব্য শ্লোগান হল, জিহাদ মানে সন্ত্রাস। মুজাহিদ অর্থ সন্ত্রাসী। আর ইসলাম হলো একটি সন্ত্রাসী মতবাদ। শত্রুতো শত্রুই। দু:খ হলো, শত্রুদের এই শ্লেগানে প্রভাবিত হয়ে কিছু বন্ধু মুসলমানও সংসয় পোষণ করতে শুরু করেছে–জিহাদ কি আসলেই সন্ত্রাস!!!????
তাদের এ সংসয়েরও কারণ আছে। আমাদের পরাজিত চিন্তার কিছু মুসলিম মনীষী পর্যন্তু শত্রুদের এই শ্লোগানে বেশ প্রভাবিত হয়েছেন  এবং  ইসলামী চিন্তা ও গবেষণার নামে একান্তু দরদসুলভ ককন্ঠে বিনীত ভাষা ও স্বরে ওযরখাহী  করার চেষ্ঠা করেছেন ইসলাম ও মুসলমানের পক্ষ থেকে। লড়াই-যুদ্ধ বলতে কিছুই নেই। একান্তু ঠেকায় পড়ে বাধ্য হয়ে অস্তিত্বের স্বার্থে মাঝে মাঝে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। এটা একান্তই প্রতিরক্ষামূলক। অন্যথায় ইসলাম শুধুই শান্তির ধর্ম; ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন শান্তি ও নিরাপত্তার মূর্তপ্রতীক-সারা জাহানের রহমত।

মূলত এই নতজানু মানসিকতা ও পরাজিত ন্তিার মূল ভিত্তি ২টা

১. জিহাদের মৌল দর্শন ও নিগূঢ় প্রকৃতি সম্পর্কে অজ্ঞতা।২. নিজস্ব ধর্ম- দর্শনের প্রতি  প্রত্যয় বিশ্বাসের অভাব এবং অতিশয় উদারতা।

এটা সন্দেহাতীত সত্য, ইসলাম অর্থই শান্তি। ইসলাম শান্তি, শৃঙ্খলা, ন্যায়, নিরাপত্তা, অনুগ্রহ, মমতা, সাধুতা ও মানবতার ধর্ম। তাই ইসলামে হিংসা, বিদ্বেষ, মারামারি, হানাহানি, ত্রাস, নৈরাজ্য, রাক্তারক্তি ইত্যাদির কাজের ও চিন্তার  অবকাশ নাই। কিন্তু জিহাদ কি সে ধরনের কোন রক্তারক্তির মধ্যে পড়ে??
এই বিষয়টি একটি উপমার মাধ্যমে দেখানো যায়। ধরুন,  এক ব্যক্তির হাতে একটি ফোড়া ওঠলো। এখন এর চিকিৎসার তিনটি পর্যায় আছে।
১. এমন কোন ঔষধ বা প্রলেপ ব্যবহার করা যাতে এর ভিতরের বিষাক্ত/দুষিত অংশ হয়তো পেকে বেরিয়ে যাবে অথবা ভিতরেই মিশে যাবে।
২. যদি না শুকিয়ে পেকে যায় তখন ফটিয়ে দুষিত অংশ বের করার ব্যবস্হা করতে হবে।
৩. যদি ফোড়া পেকে বিস্তৃত হতে থাকে এবং শরীরে পচন বৃদ্ধি করতে থাকে তখন সেটা অপারেশন করতে হবে এবং পচা অংশ কেটে ফেলে দিতে হবে।
এই অবস্হায়  যদি কোন সুচিকিৎসক কারো শরীরের পচা অংশকে কেটে ফেলে দেয় তাহলে রোগীর আত্নীয়-স্বজন সকলেই ঐ চিকিৎসককে কৃতজ্ঞতা জানায়। বরং তার উপর উচ্চ ফিস ও সম্মানি দেয়। চীরকাল তার কথা মনে রাখে। কেননা পচা অংশ কেটে বাদ দেওয়ার কারনে শরীরের অবশিষ্ট অংশ বেচেছে। পৃথিবীর কোন সুস্হ মানুষ চিকিৎসকের এই কাটাকুটির আচরণকে অত্যাচারী কিংবা পাশবিক আচরণ বলে না। অনুরূপ হযরতে আম্বিয়ায়ে কেরাম হলেন মানবজাতির আত্নিক চিকিৎসক। আল্লাহ তার এই বিশাল জগত সংসারের সুস্হতা বিধানের জন্যই পাঠিয়েছেন নবী-রাসূলগণকে। তাই মানবসংসারে যখন কুফুরী ও অবাধ্যতার ফেড়া দেখা দেয় তখর ওয়াযও উপদেশের প্রলপ মেখে তাকে সুস্হ  করতে চেষ্ঠা করেন। যদি এই প্রাথমিক চিকিৎসায় কাজ না হয় বরং তা অন্যান্য সুস্হ অঙ্গগুলোকে (ঈমানদারগনকে) পর্যন্ত বিনষ্ট ও পচনখুখী করবার উপক্রম হয় তখন সেই গলিত অংশটি কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়– যাতে মানব-সংসারের অবশিষ্ট অংশগুলো সুস্হ থাকে এবং জগত-সংসারের এই গলিত অংশটি চিরতরে নি:শেষ হয়ে যায়।

হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ) বিষয়টিিআরেকটু পরিস্কার করে এইভাবে বলেছেন— জিহাদ হলো একটি অপারেশনের মতো বিষয়। কারণ, রোগ দুই প্রকার- সংক্রামক ও অসংক্রামক। অসংক্রামক ও স্হির ব্যধিকে জায়গায় রেখে চিকিৎসা করে দুর করা যায়। কিন্তু যে রোগ সংক্রামক  ও সম্প্রসারক- ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ার মত সেটাকে দ্রুত অপরেশন করে জীবাণূ বের করে ফেলতে হয়। কারণ, সেটাকে শরীরে অবস্হানের সুযোগ দিলে শরীরের সুস্হ অংশটাও দ্রুত আক্রান্ত হয়ে পড়বে।
তেমনিভাবে ইসলামের শত্রুরাও দুই প্রকার। এক প্রকার শত্রু হলো যাদের সাথে সন্ধি করা যায় এবং সন্ধি হয়ে গেলে তারা আর অনর্থক ঝামেলা সৃষ্টি করবে না। এদের সাথে জিহাদের প্রয়োজন হয় না। দ্বিতীয় প্রকার হলো এমনসব চিরবক্র ও রুগ্ন শত্রু যাদের মধ্যে শলা-সন্ধির কোন সুযোগই নাই। এই সংক্রামক ও সম্প্রসারক অংশের অপরেশনের কোন বিকল্প নাই। আর এই অপারেশনই হলো জিহাদ।
সুতরাং জিহাদের লক্ষ্য আদৌ কাউকে মুসলমান বানানো নয়– বরং মুসলমানগনকে সংরক্ষণ করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

এবং এটা একান্ত ভিত্তিহীন অভিযোগ, ইসলাম  তলোয়ারের মাধ্যমে সম্পসারিত প্রতিষষ্ঠিত হয়েছে। কারণ, ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করাই যদি জিহাদের লক্ষ্য হতো তাহলে যুদ্ধবিরতির জন্য যিযিয়া বা কর আদায়ের প্রথা অনুমোদিত হতো না। তাছাড়া হযরত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ থেকে বিশ্বময় কত জিহাদই তো সংঘটিত হয়েছে, পৃথিবীর কত মাটিই তো লাল হয়েছে জিহাদের তপ্ত আহবানে কিন্তু একথা কি কেউ ইতিহাসের পাতা থেকে প্রমাণ করতে পারবে, ইসলামের এই চৌদ্দশ বছরের দীর্ঘ পরিসরে একজন কাফেরকেও ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করা হয়েছে। বরং ইতিহাসে এ কথারই প্রমাণ করে, মুসলমানগণ যখনই কোন দেশ যুদ্ধ করে জয় করেছেন তখন প্রসন্ন বদন ও চিত্তে সে এলাকার অধিবাসীদেরকে তাদের ধর্মের উপরই ছেড়ে দিয়েছেন। অত:পর দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। উন্নত জীবনবোধ, সুরভিত চরিত্র সৌন্দর্য ও চিত্তাকর্ষক কর্মকান্ড ইসলামের অপার নীতি সৌকর্য তাদের হৃদয়-মন-বিশ্বাস-অনুভুতিকে সজোরে টেনে এনেছে ইসলামের দিকে। তাদের অতীত অন্ত:সারশূণ্য যুক্তিহীন চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস ইসলামের শক্তিমান আলোকিত সথ্যের কাছে পরাজিত হয়েছে আর তারা লূপান্তরিত আত্নার আবেদনেই বিগলিত মন ও বিশ্বাসে বলে উঠেছে- আশহাদু আল্-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ……………..।
অধিকন্তু একথা বলারও অবকাশ নেই, মানব নিধনের লক্ষ্যেই মুসলমানগণ জিহাদ করেন। বারণ, একথা সকলেই জানে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াষাল্লাম যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন তারা ছিল দুর্ধর্ষ হিংস্র লড়াকু আরবগোষ্ঠী।  মূর্তিপূজক, ইহুদী-খৃষ্ঠান ও বিবেক-পূজারী সকলের সাথেই তার যুদ্ধ হয়েছে। প্রিয় নবীজীর আমলেই যুদ্ধ হয়েছে প্রায় বাষট্টিটি। এর মধ্যে প্রায় ২৭টিতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  নিজে উপস্হিত ছিলেন। অথচ সুদীর্ঘ এই যুদ্ধ-জীহাদে উভয়পক্ষের লাসের সংখ্যা মাত্র ১৮০০।
এটিকে একান্তই বিষ্ময়কর বলতে হবে,  কিংবা বলতে হবে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন্ত মু‘মিযা যে, একটি রক্তপিপাসু, যুদ্দবাজ, বর্বর, শিক্ষা ও আর্শবিমূখ বিশৃঙ্খল জাতিকে একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, সুসংহত, আইনসিদ্ধ ও আদর্শের কাছে সমর্পিত দশ লক্ষ বর্গ মাইলব্যাপী বিশাল সাম্রাজ্য শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে জান দিতে হয়েছে মাত্র আঠারশত মানুষকে। তাও আবার শত্রু-মিত্র উভয়পক্ষের  এবং এই ১৮০০ নিহতের মধ্যে তারাও শামিল, বনূকুরাইজার যেসব ইহুদীদেরকে তাদের লোকেরা তাদেরই আইনমতে বরবাদ করে দিয়েছিল।

আশ্চার্য হলেও সত্য, আজ যেসব কথিত উন্নত দেশ ও গোষ্ঠী যারা ভিম্ভময় মানবতার ফেরী করে বেড়ায়, যারা আন্তর্জাতিক মানবতার এজেন্সী খুলে বসে আছে, তাদের উন্নত (!!??) দেশের পথে-প্রান্তরে দৈনন্দিন বিচ্ছন্ন ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা রে চেয়ে ঢের বেশী। অতি হাস্যসম্পদ ঘটনা হলো, গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তিন কোটিরও বেশি লাশের নাজরানা দিয়ে যারা পৃথিবীর এক ইঞ্চি মাটিতেও পূর্ণাঙ্গ শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলো না তারাই ক্যানভাস করে বেড়ায় হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুনী এবং ইসলাম খুনের ধর্ম, সন্ত্রাসের ধর্ম। বড়ই বিচিত্র তাদের দৃষ্টি, ভীষণ রঙ্গীলা তাদের মানবতা। ত্রাসে পৃথিবীর অসহায় দুর্বল সকল মানবগোষ্ঠী সকাল-সন্ধা মুক্তি প্রর্থনা করে ফিরে বিশ্ব জাহানের মালিকের দরবারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE