তাকওয়া হাসিলের হাতিয়ার-২

তাকওয়া হাসিলের আরেক হাতিয়ার: হিম্মত
যতটুকু হিম্মত আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন তা কাজে লাগান এবং এভাবে আগে বাড়তে থাক। হিম্মত এমন এক শক্তি যার মোকাবেলা করার মত অন্য কোনো শক্তি দুনিয়াতে নেই। এই যে সিগারেটের অভ্যাস। কত মানুষ সিগারেটের অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছে। নিয়ত করে, খাবে না, আবার শুরু করে । আবার নিয়ত করে, খাবে না, আবার শুরু করে। এভাবে শেষবার যখন বলে- নাহ্, আর খাব না। তখন আর খায় না। তো এই হিম্মতটা আল্লাহর কাছে অনেক দামী। হিম্মতের সাথে আল্লাহর রহমতের খুব বেশী সম্পর্ক। হিম্মত হলে আল্লাহর রহমত আসেগোনাহ থেকে বাঁচার, তাকওয়া হাসিল করার যত উপায় আছে এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর হল হিম্মত করা। আল্লাহ দেখছেন, বান্দা আমার জন্যে চেষ্টা করছে।

وَمَنْ أَرَادَ الْآَخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَئِكَ كَانَ سَعْيُهُمْ مَشْكُورًا

এ আয়াতের ‘সা‘আ লাহা’-এর দ্বারা হিম্মত বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এই হিম্মতের কদর করবেন- এই ওয়াদা আল্লাহ তাআলা আগেই দিয়েছেন। বান্দা হিম্মতকে কাজে লাগালে আল্লাহ বলেন, আমি হিম্মতের শোকর করব। এজন্যে দেখা যায়, বান্দা যখন তার সর্বোচ্চ হিম্মতকে কাজে লাগায়, তখন সে সফল হবেই। হিম্মতের সাথে আল্লাহর ওয়াদা ।

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ

যে মুজাহাদা করবে আমি তাকে আমার পথে পরিচালিত করব’। (সূরা আনকাবূত ২৯ : ৬৯)
এখানে ‘রাসত্মা দেখাব’ দ্বারা তরজমা করার চেয়ে ‘পরিচালিত করব’ দ্বারা তরজমা করা সুন্দর । কারণ রাসত্মা তো আল্লাহ কুরআন সুন্নাহর মাধ্যমে দেখিয়েছেন।

এখানে অর্থ হল, আল্লাহ তাআলা তার পথে পরিচালিত করবেন। আমাদের শাইখুল হাদীস ছাহেব এই তরজমা করতেন। এখানে বলা হয়েছে মোজাহাদা করার কথা। আর আসল মোজাহাদা হল হিম্মত ব্যবহার করা। বান্দা তার হিম্মত ব্যবহার করলে আল্লাহর নুসরত আসবেই।

তো কেউ যদি তাকওয়া হাসিল করতে চায় তাহলে এ চার পদ্ধতি তাকে অবলম্বন করতে হবে। জিগার মুরাদাবাদীর ঘটনা দেখ- একবার খাজা আযীযুল হাসান মাজযুব রাহ.-এর সাথে তার দেখা। তিনি বললেন, খাজা ছাহেব, থানবী রাহ.-এর কাছে যেতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এ চেহারা সুরত নিয়ে এমন একজন আলিমের কাছে কীভাবে যাই! খাজা ছাহেবও বললেন, হাঁ, এই হালতে কীভাবে যাবেন। সৌভাগ্যক্রমে খাজা ছাহেব হযরত থানবী রাহ.-কে কথাগুলো বললেন- জিগার মুরাদাবাদীর সাথে দেখা হয়েছিল। সে এই এই বলেছিল, আমি এই এই বলেছিলাম। হযরত থানবী রাহ. বললেন, আহ! খাজা ছাহেব, আমি তো মনে করেছিলাম, তাসাউফের সাথে আপনার মোনাসাবাত হয়ে গেছে। এখন তো দেখছি, এর হাওয়া বাতাসও আপনার গায়ে লাগেনি। আপনার তো বলা উচিত ছিল- না, এই অবস্থায়ই আস।

এই বুজুর্গরা তো আল্লাহর খলিফা। তাদের দরজা সবার জন্য খোলা।

ايں درگاہ ما در کاہ نا اميدی نيست

এই দরবার তো সকলের জন্য উম্মুক্ত’। যারা আল্লাহর রাসূলের নায়েব তাদের দরজাও তো সবার জন্যে খোলা। যে হালতে আছ এসে যাও।

জিগার মুরাদাবাদীর সাথে খাজা ছাহেবের আবার যখন দেখা হল, তখন খাজা সাহেব জিগার মুরাদাবাদীকে হযরতের কথাগুলো বললেন। হযরতের কথা শুনে জিগার মুরাদাবাদীর কিছুটা হিম্মত হল।

তিনি শরাবপানে অভ্যস্ত ছিলেন। হযরতের কাছে যখন আসা-যাওয়া শুরু করলেন, তখন তওবা করলেন, আর শরাব পান করবেন না। শরাব পান করার পুরানো অভ্যাস তার ছাড়তে অনেক কষ্ট হল। শরাব ছেড়ে দেয়ার কারণে যখন তার জান যায় যায় অবস্থা তখন একজন বলেছিল, এমন হালতে তো হারাম খাওয়াও জায়েয। তিনি বললেন, না। জান বের হয়ে গেলেও আমি শরাব পান করব না।

তো হিম্মত এটা কোনো ওয়াজের বিষয় না। এটা কাজ করার বিষয়। সুতরাং হিম্মত কর। গোনাহ থেকে বেঁচে থাক।

নেক আমল কর:
(আরেকজন প্রশ্ন করলেন, যারা ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারী দুনিয়াতে তাদের উপরও কি বিভিন্ন বিপদ-আপদ আসতে পারে? দুনিয়াতে তারাও বিপদ-আপদের সম্মুখীন হতে পারে? তার প্রশ্নের জবাবে হুযুর বললেন,) ঈমান ও তাকওয়া যার ভেতরে থাকবে, দুনিয়াবী বিপদ-আপদে কখনো কখনো তাকেও কষ্ট করতে হবে; তবে সে কখনো বেচাইন ও পেরেশান হবে না। দুনিয়ার বিভিন্ন হালতে তার কষ্ট হবে; তবে হায়-হুতাশের যে পেরেশানী এমন পেরেশানী তার মধ্যে কখনো হবে না। এবিষয়টাকে হাকীম আখতার ছাহেব রাহ. একটি কবিতায় বলেছেন একভাবে। যদি বেআদবি না হয় তাহলে বলি, আমার আম্মা ঐ কবিতাটিকে বলেছেন আরেকটু পরিবর্তন করে। হযরতের কবিতাটি ছিল এরকম-

زندگی پر کیف پاۓ گرچہ دل پر غم رہا تيرے غم کے فيض سے میں غم میں بھی بے غم رہا

হাকীম ছাহেবের শেরের মধ্যে একটি প্রশ্ন আসে। তা হল, সেখানে জীবনকে বানিয়ে দেয়া হয়েছে আনন্দময় আর দিলকে বানানো হয়েছে অস্থির ও পেরেশান। অথচ মুমিনের অবস্থা হয়ে থাকে এর থেকে ব্যতিক্রম। কারণ জীবনে অস্থিরতা ও পেরেশানী থাকলে তার অন্তর থাকে নিশ্চিন্ত এবং সর্ব প্রকার পেরেশানীমুক্ত। এটি আম্মার খাতায় আমি লেখা দেখেছি এভাবে-

زندگی پر کیف پاۓ گرچہ غم پر غم رہا ان کے غم کے فيض سے میں غم میں بھی بے غم رہا

আমার যিন্দেগীটা বড় মজার যিন্দেগী, যদিও সেখানে ছিল অনেক পেরেশানী। কিন্তু আমি ছিলাম আল্লাহর মুহাববতের ব্যথায় ব্যথিত। এজন্যে অন্য কোনো ব্যথা আমাকে স্পর্শ করতে পারেনি।’ এভাবে হলে আর আগের প্রশ্নটি আসে না। হাকীম ছাহেবের দ্বিতীয় লাইন শুরু হয়েছিল ‘তেরে’ দিয়ে। কিন্তু আম্মার খাতায় লেখা ছিল ‘উনকে’ দিয়ে। এই ‘উনকে’ শব্দটি ইসহাক ওবায়দী ছাহেবের সম্পাদনা।

(গত রমযানের শেষ দশকে মারকাযুদ দাওয়াহ’র হযরতপুর প্রাঙ্গণের মসজিদে প্রদত্ত হযরত মাওলানা আবদুল মালেক ছাহেব দা. বা.-এর একটি বয়ান)

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE