জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৩

পূর্ববর্তী অংশসমূহ:
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-১
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-২

একটি প্রশ্ন ও তার জবাব

কেউ বলতে পারে যে, الصلاة على وقتها কে তো আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় বলে বলা হয়েছে। কোনো বিষয় অধিক প্রিয় তখনই হয় যখন ঐ বিষয়টির মধ্যে একাধিক ঐচিছকতা বিদ্যমান থাকে এবং তন্মধ্য হতে একটি ঐচ্ছিক বিষয় অন্যটির তুলনায় প্রিয় হয়ে থাকে। সময়মত সালাত আদায় করা বা কাযা না করা তো অপরিহার্য। অপরিহার্যের মধ্যে কোনো ঐচ্ছিকতা থাকে না। সুতরাং বোঝা যায় যে, হাদীসটিতে বলা হয়েছে, যে কোনো সময়ে সালাত আদায় করা বৈধ তবে অন্য যে কোনো সময়ে আদায় করার তুলনায় আউয়াল ওয়াক্তে সালাত আদায় করা মুস্তাহাব বা অধিক প্রিয়।

এর জবাবে বলব যে, কথাটি যুক্তিযুক্ত। তবে কথাটি আলোচ্য বিষয়ে প্রযোজ্য হত যদি প্রশ্ন করা হত যে, কোন্ সময়ে সালাত আদায় করা উত্তম। এখানে প্রশ্ন করা হয়েছে, কোন্ আমলটি সর্বাধিক উত্তম? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, الصلاة على وقتها অর্থাৎ অন্যান্য আমলের তুলনায় সালাতকে সময়মত আদায় করা এবং কাযা না করা অধিক প্রিয়। তুলনা করা হয়েছে অন্যান্য আমলের সঙ্গে। বলা হয়েছে, সালাত কাযা না করা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল। সালাতের পূর্ণ সময়ের একটি অংশকে অপর অংশের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি।

কথা আরও আছে। তা হল, একাধিক ঐচ্ছিক সময়ের মধ্য হতে আউয়াল বা শুরু সময়ের কথাটি বোঝা গেল কোত্থেকে? এ অর্থ কেন হবে না যে, একাধিক ঐচ্ছিক সময়ের মধ্য হতে মধ্যবর্তী সময়ে বা শেষ সময়ে সালাত আদায় করা অন্য সময়ের তুলনায় অধিক প্রিয়?

এই দীর্ঘ আলোচনার সার দাঁড়ালো এই যে, হাদীসটিকে যাঁরা الصلاة فى أول وقتها শব্দে বর্ণনা করেছেন তাঁরা হয় স্মৃতি বিভ্রাটের শিকার হয়েছেন নয় তো অর্থ বিভ্রাটের শিকার হয়েছেন। কারণ যা-ই হোক, তাঁদের বর্ণনাটি দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। আর দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনাকে মুহাদ্দিসগণ যঈফ বলেন। সম্ভবত এই কারণেই ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম রাহ. তাঁদের গ্রন্থে ঐ শব্দ সম্বলিত হাদীসটিকে স্থান দেননি। যদিও এর বর্ণনাকারীগণের বর্ণিত অন্য হাদীস তাঁরা গ্রহণ করেছেন। আর এই কারণেই ইমাম নববী রাহ. الصلاة فى أول وقتها শব্দে বর্ণিত সকল হাদীসকে যঈফ বলে মত প্রকাশ করেছেন। হাফেয ইব্ন হাজার আসকালানী রাহ. তাঁর ফতহুল বারী গ্রন্থে ইমাম নববী রাহ.-কে উদ্ধৃত করে বলেছেন,

وقد اطلق النووى فى شرح المهذب أن واية فى أول وقتها ضعيفة

অর্থাৎ শরহুল মুহায্যাব গ্রন্থে নববী রাহ. ব্যাপকভাবে (কোন ব্যতিক্রম উল্লেখ না করে) বলেছেন যে, فى أول وقتها বর্ণনা যঈফ।

উল্লেখ্য, এ পর্যন্ত হাফেজ ইবন হাজার আসকালানীকে উদ্ধৃত করে আমি যা লিখেছি তা যাচাই করতে দেখুন ফাতহুল বারী ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ১১ ও ১২, প্রকাশক: দারুল হাদীস, কায়রো।

সহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা না যথার্থ ব্যাখ্যা ?

লেখক এরপর লিখেছেন, মূলত ছহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা করে দেরী করে ছালাত আদায় করা হয়।

এ সম্পর্কে পরে আলোচনা আসছে। এরপর লেখক লিখেছেন, অনেক মসজিদে ফর্সা হলে ছালাত শুরু করা হয় এবং বিদ্যুত বা আলো বন্ধ করে কৃত্রিম অন্ধকার তৈরি করা হয়। এটা শরীয়তের সাথে প্রতারণা করার শামিল। হাঁ, অবশ্যই এটা প্রতারণা। লেখক স্পষ্ট করেননি, কারা এই কাজটি করে থাকে। কারণ, বিষয়টি এমনিতেই স্পষ্ট। এটা করে থাকে তারা যারা অন্ধকারে ফজর আদায় করাকে মুস্তাহাব বলে মনে করে। যারা ফর্সা করে ফজর আদায় করাকে মুস্তাহাব বলে মনে করে তারা এটা করবে না। তারা বরং উল্টোটা করবে। তারা অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে কৃত্রিম ফর্সা তৈরির চেষ্টা করবে।

মুহতারাম,

লেখক এই অধ্যায়ে মূলত ফজরের সালাত অন্ধকারে আদায় করা তথা তাগলীস বিল ফাজর যে মুস্তাহাব তা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণ করতে চাইছেন। আপনি জানেন যে, কারও কারও মতে ফজরকে ফর্সা করে আদায় করা তথা ইসফার বিল ফাজর মুস্তাহাব। লেখক এই দ্বিতীয় মতটির পক্ষের হাদীসগুলোকে জাল প্রমাণ করতে চাইছেন। এ জন্য তিনি শুরুতেই হযরত মুআজ ইবন জাবাল রা.-এর একটি হাদীস উপস্থাপন করেছেন যা দ্বিতীয় মতটিকে সমর্থন করে। লেখক বলছেন, হাদীসটি জাল। আমারও তাই মনে হয়। কিন্তু ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ এই হাদীসকে তাঁদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে কোথাও উপস্থাপন করেছেন বলে আমার জানা নাই। এই মতের অনুসারীদের কেউ বিচ্ছিন্নভাবে এটিকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করলে করতেও পারে কিন্তু তার দায় দায়িত্ব এই মতের প্রবক্তাগণের উপর কিংবা এই মতের অনুসারীদের সকলের উপর চাপানোকে আমি ন্যায়সংগত মনে করি না।

ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ যে সব সহীহ হাদীসকে তাঁদের মতের পক্ষে দলীল হিসাবে উপস্থাপন করে থাকেন লেখকের মতে সেসব হাদীসের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। এইজন্য তিনি এরপর ‘ছহীহ হাদীসের অপব্যাখ্যা’ নামে একটি শিরোনাম কায়েম করেছেন। এই শিরোনামের অধীনে তিনি রাফে‘ ইব্ন খাদীজ রা.-এর একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীসটি এই-

عَنْ رَافِع بْنِ خَدِيْجٍ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ أَسْفِرُوْا بِالْفَجْرِ فَإِنَّهُ أَعْظَمُ لِلْأَجْرِ

হাদীসটির প্রথম বাক্যের অনুবাদ তিনি করেছেন এইভাবে: ‘তোমরা ফজরের মাধ্যমে ফর্সা কর’। অনুবাদের সামান্য হেরফেরে বাক্যের মর্ম ও উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটে যায়। মর্ম ও উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটানোর উদ্দেশ্যেই লেখক এইরূপ অনুবাদ করেছেন, না অনুবাদে অদক্ষতার কারণে বা আরবী ভাষায় দখল না থাকার কারণে এইরূপ অনুবাদ করেছেন তা আল্লাহই ভাল জানেন। সঠিক অনুবাদ এইরূপ হবে বলে আমি মনে করি: ‘তোমরা ফজরকে (তথা ফজরের সালাতকে) ফর্সায় উপণীত কর।’ কারণ, اسفار শব্দটি سفر হতে গঠিত। سفر অর্থ আলো ও উজ্জ্বলতা। বলা হয়, سفر الصبح (অর্থাৎ প্রভাত আলোকোজ্জ্বল হয়েছে।) বাবে ইফ্আলে এর অর্থ হল, প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় প্রবেশ করা, প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় উপণীত হওয়া। বলা হয়, اسفر بلال তথা دخل بلال فى سفر الصبح (অর্থাৎ বেলাল প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় প্রবেশ করেছে।) যেমন বলা হয় اصبح بلال (অর্থাৎ বেলাল প্রভাতে প্রবেশ করেছে, প্রভাতে উপণীত হয়েছে। তথা প্রভাত করেছে।)
কুরআন মজীদে বলা হয়েছে:
فسبحان الله حين تمسون و حين تصبحون
[তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তোমরা সন্ধ্যা কর ও সকাল কর। (তথা সন্ধ্যায় ও সকালে।) – সূরা রূম, আয়াত ১৭]
অতএব إسفار মাসদার হতে গঠিত আদেশ সূচক শব্দ أسفروا -এর অর্থ হল, তোমরা প্রভাতের আলোকোজ্জ্বলতায় প্রবেশ কর তথা ফর্সা কর। এরপর যখন بالصبح বলে حرف الجر -‘با’ (preposition) দ্বারা ক্রিয়াটিকে সকর্মক ক্রিয়া (متعدى) বা transitive verb-এ পরিণত করা হল তখন নিয়ম অনুযায়ী এর অর্থ হবে তোমরা ফজরের সালাতকে ফর্সায় উপণীত কর। এতদ্বারা ইসফার বিল ফাজর -এর প্রবক্তাগণের মতের পক্ষে সমর্থন মেলে।

এরপর লেখক এই হাদীসের সমার্থক আরেকটি হাদীস উল্লেখ করেছেন। হাদীস দুটি ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ তাঁদের মতের সপক্ষে দলীল হিসাবে পেশ করে থাকেন। লেখক হাদীস দুটিকে সহীহ বলেছেন। কিন্তু তাঁর দাবি হল, ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণ হাদীস দুটির অপব্যাখ্যা করে থাকেন। তাঁর এই দাবি প্রমাণ করার পূর্বে তিনি প্রসঙ্গত বলেছেন,‘ ‘হেদায়া’ কিতাবে প্রথম আলোচনায় সঠিক সময় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরে পৃথক আলোচনায় বলা হয়েছে, ويستحب الإسفار بالفجر ‘ফর্সা করে ফজর ছালাত আদায় করা মুস্তাহাব’। অথচ উক্ত ব্যাখ্যা চরম বিভ্রান্তিকর এবং ছহীহ হাদীসের প্রকাশ্য বিরোধী।’ (দ্রষ্টব্য পুস্তকের ১২৫নং পৃষ্ঠা)

হেদায়া প্রণেতা কী বলেছেন আর মুযাফফর সাহেব কী বুঝলেন

 

পরবর্তী অংশসমূহ:
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৪
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৫
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৬
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৭
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৮
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৯
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-১০

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE