জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৫

পূর্ববর্তী অংশসমূহ:
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-১
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-২
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৩
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৪

 

উপরিউক্ত দাবি সম্পর্কে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

এই ইদরাজ তথা হাদীসের মধ্যে রাবী কর্তৃক হাদীসের কোনো অংশের ব্যাখ্যা বা মন্তব্য অন্তর্ভুক্তির ঘটনা কিছু হলেও ঘটেছে। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী রাহ. আবূ হাতেমের সনদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন যে, ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বাল বলেন,

كان وكيع يقول فى الحديث _ يعنى كذا وكذا _ وربما حذف “يعنى” وذكر التفسير فى الحديث

অর্থাৎ ওয়াকী‘ (বিখ্যাত মুহাদ্দিস) হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেন -অর্থাৎ এইরূপ এইরূপ- এবং অনেক সময় তিনি ‘অর্থাৎ’ কথাটিকে অনুচ্চারিত রেখেছেন এবং হাদীসের মাঝে স্বীয় ব্যাখ্যা উল্লেখ করে দিয়েছেন। আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী বলেন,

وكذا كان الزهرى يفسر الأحاديث كثيرا وربما أسقط أداة التفسير فكان بعض أقرانه ربما يقول له: افصل كلامك من كلام النبى – صلى الله عليه وسلم-

অর্থাৎ, তদ্রূপ যুহরী অনেক সময় হাদীসের ব্যাখ্যা করতেন এবং ব্যাখ্যা নির্দেশক অব্যয়কে ছেড়ে দিতেন। এই কারণে তাঁর সঙ্গীদের কেউ একজন তাঁকে বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা হতে আপনার কথাকে পৃথক রাখুন। দ্রষ্টব্য: النكت على كتاب ابن الصلاح , বিশ নম্বর অধ্যায়, মুদরাজ সংক্রান্ত আলোচনা পৃষ্ঠা ৩৪৯।

তবে মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন নিদর্শনাবলী দ্বারা এইসব ইদরাজকে চিw‎হ্নতও করেছেন। উসূলে হাদীস ও মুহাদ্দিসগণের পরিভাষা সংক্রান্ত শাস্ত্রে এতদসম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পাওয়া যায়।

মূল আলোচনায় প্রত্যাবর্তণ

তো ইবন মাজার হাদীসে تعنى শব্দটি প্রমাণ করে যে, من الغلس বা অন্ধকারের কারণে কথাটি কোনো রাবী কর্তৃক সংযোজিত, হযরত আয়েশার কথা নয়। ‘শরহু মাআনিল আছারে’ ইমাম তাহাবী রাহ. কর্তৃক তাখরীজকৃত একটি হাদীসে শব্দটির কোন অস্তিত্বই নাই। হাদীসটি এই :

حَدَّثَنَا يُونُسُ قَالَ: ثنا سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ , عَنِ الزُّهْرِيِّ , عَنْ عُرْوَةَ , عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهَا , قَالَتْ: ” كُنَّا نِسَاءً مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ يُصَلِّينَ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةَ الصُّبْحِ , مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوطِهِنَّ , ثُمَّ يَرْجِعْنَ إِلَى أَهْلِهِنَّ , وَمَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ

হাদীসটির সনদ অত্যন্ত শক্তিশালী। হাদীসটি ইদরাজের দাবিকে আরও জোরালো করে। কাজেই হযরত আয়েশার হাদীস দ্বারা তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে প্রমাণ গ্রহণ শক্তিশালী নয়, দুর্বল বলেই প্রতীয়মান হয়।

তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে লেখকের দ্বিতীয় দলীল

নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদের একটি হাদীস। হাদীসটি হযরত আনাস রা. কর্তৃক বর্ণিত।

পূর্বেই বলেছি যে, হযরত আয়েশা রা.-এর একটি হাদীসকেই লেখক তিনবার এনে তিনটি নম্বর লাগিয়েছেন। উদ্দেশ্য, পক্ষের দলীলের আধিক্য দেখানো। অতএব উক্ত হাদীসকে একটি দলীল হিসাবেই গণ্য করা উচিত। এজন্য আমি বলছি, লেখক চতুর্থ নম্বরে যে হাদীসটি পেশ করেছেন তা তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে তাঁর দ্বিতীয় দলীল। হাদীসটির শেষে বলা হয়েছে, وَالصُّبْحَ اِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ إِلَى أَنْ يَنْفَسِحَ الْبَصَرُ (এবং ফজরের সালাত আদায় করতেন ফজর যখন উদিত হত তখন থেকে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত।)

হাদীসটি তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে দলীল হয় না । কারণ, ‘দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত’ কথাটির অর্থ হল, ফর্সা হওয়া পর্যন্ত। হাদীসটির এক মর্ম হতে পারে এই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন ফজর উদিত হওয়া থেকে শুরু করে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত সালাত দীর্ঘ করে সালাত আদায় করতেন। তাই যদি হয় তাহলে তাগলীস বিল ফাজর মুস্তাহাব প্রমাণিত হয় কী করে? তাগলীস বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের দাবি তো এই যে, অন্ধকারে শুরু করা এবং অন্ধকারেই শেষ করা মুস্তাহাব। অথচ হাদীসটি থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত শুরু করতেন অন্ধকারে আর শেষ করতেন ফর্সা করে। হাদীসটির আরেকটি মর্মও হতে পারে। তা হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর উদিত হওয়া থেকে শুরু করে দৃষ্টি প্রসারিত হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সালাত আদায় করতেন। কোনোদিন অন্ধকারে শুরু করে অন্ধকারে শেষ করতেন। কোনোদিন অন্ধকারে শুরু করে ফর্সা করে শেষ করতেন। কোনোদিন ফর্সা করে শুরু করে ফর্সা করে শেষ করতেন। এই মর্ম গ্রহণ করলেও হাদীসটি দ্বারা তাগলীস বিল ফাজর মুস্তাহাব প্রমাণিত হয় না।

পাঁচ নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের তৃতীয় দলীল

হযরত জাবের রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদীস। হাদীসটির শেষে আছে والصُّبْحَ بِغَلَسٍ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাত আদায় করতেন অন্ধকারে।

হাঁ, এই হাদীস দ্বারা বাহ্যত বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধকারে ফজর আদায় করতেন। তবে এই দলীল সম্পর্কে এই লেখার শেষ দিকে কিছু বলব ইনশাআল্লাহ।

উল্লেখ্য , লেখক হাদীসটির বরাত দিয়েছেন, ‘সহীহ আবু দাউদ হা/৩৯৭। অথচ হাদীসটি সহীহ বুখারীতে ও সহীহ মুসলিমেও আছে। (বুখারী হাদীস নং ৫৬৫, মুসলিম হাদীস নং ৬৪৬) কোনো হাদীস বুখারী ও মুসলিম শরীফে থাকলে তো কথাই নেই এতদুভয়ের কোন একটিতে থাকলেও অন্য কিতাবের বরাত দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হলেও সঙ্গে বুখারী ও মুসলিমের বরাত অবশ্যই দেওয়া হয়। তার কারণ ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। সম্ভবত লেখকের খবরই নেই যে, হাদীসটি বুখারী ও মুসলিম শরীফে আছে। এই যদি লেখকের অবস্থা হয় তাহলে তাঁর মনে যা আসবে তাই তিনি লিখবেন এটাই স্বাভাবিক। তিনি সহীহ হাদীসের আলোকে আদায়কৃত সালাতকে, সাহাবী ও তাবেঈগণের সালাতকে জাল হাদীস দ্বারা আক্রান্ত মনে করবেন এটাই স্বাভাবিক। থাকুক সে কথা। আমাদের আলোচনায় ফিরে আসি।

ছয় নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের চতুর্থ দলীল

সহীহ বুখারীর এই হাদীস :

وَكَانَ يُصَلِّى الصُّبْحَ وَمَايَعْرِفُ أَحَدُنَا جَلِيْسَهُ الَّذِىْ كَانَ يَعْرِفُهُ وَكَانَ يَقْرَأُ فِيْهَا مِنَ السِّتِّيْنَ إِلَى الْمِأَةِ

অর্থাৎ রাসূল (ছাঃ) ফজরের ছালাত এমন সময়ে পড়তেন, যখন আমাদের কেউ পার্শেব বসা ব্যক্তিকে চিনতে পারত না, যাকে সে আগে থেকেই চিনে। তিনি ফজর ছালাতে ৬০ থেকে ১০০টি আয়াত তেলাওয়াত করতেন। (লেখকের অনুবাদ)

ইসফার বিল ফাজরের প্রবক্তাগণের পক্ষে পেশকৃত আবূ বার্যাহ আসলামী রা. কর্তৃক বর্ণিত বুখারী শরীফেরই একটি হাদীসের সঙ্গে আলোচ্য হাদীসটির বাহ্যত বিরোধ পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবূ বারযাহ আসলামী রা-এর হাদীসটিকে আমার এই লেখনীতে ইসফার বিল ফাজরের পক্ষে চতুর্থ দলীল হিসাবে দেখানো হয়েছে। সেই হাদীসটিতে বলা হয়েছে,

وّكَانَ يَنْفَتِلُ مِنْ صَلَاةِ الْغَدَاةِ حِيْنَ يَعْرِفُ الرَّجُلُ جَلِيْسَهُ

(এবং তিনি ফজরের সালাত সম্পন্ন করতেন যখন ব্যক্তি তার পার্শেব উপবিষ্ট ব্যক্তিকে চিনতে পারত।) এই বিরোধ নিষ্পত্তির উপায় কী লেখক তা বলেননি। কেন বলেননি? এটিও তো বুখারীর হাদীস। তাহলে এটিকে আমলে না নিয়ে এটির বিরোধী হাদীসকে দলীল হিসাবে উপস্থাপন কি একদেশদর্শিতা নয়? আমরা অবশ্য এই বিরোধের নিষ্পত্তি কীভাবে হবে তা নিয়ে পরে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

সাত নম্বরে উল্লেখকৃত লেখকের পঞ্চম দলীল

তা হল, সুনানে আবু দাউদের একটি হাদীস। যাতে বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার ফজরের সালাত অন্ধকারে আদায় করলেন অতঃপর একবার আদায় করলেন ইসফার করে। অতঃপর আমৃত্যু তাঁর সালাত ছিল অন্ধকারে। তিনি আর ইসফার করেননি।

লেখক হাদীসটির যে তরজমা করেছেন এবং অতঃপর যে মন্তব্য করেছেন তা নিয়ে পরে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। তার পূর্বে হাদীসটি নিয়েই কিছু আলোচনা আছে।

এই হাদীসটি আসলে লম্বা একটি হাদীসের টুকরা। পুরো হাদীসটি এইরূপ:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَلَمَةَ الْمُرَادِىُّ حَدَّثَنَا ابْنُ وَهْبٍ عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ اللَّيْثِىِّ أَنَّ ابْنَ شِهَابٍ أَخْبَرَهُ أَنَّ عُمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ كَانَ قَاعِدًا عَلَى الْمِنْبَرِ فَأَخَّرَ الْعَصْرَ شَيْئًا فَقَالَ لَهُ عُرْوَةُ بْنُ الزُّبَيْرِ أَمَا إِنَّ جِبْرِيلَ -صلى الله عليه وسلم- قَدْ أَخْبَرَ مُحَمَّدًا -صلى الله عليه وسلم- بِوَقْتِ الصَّلاَةِ فَقَالَ لَهُ عُمَرُ اعْلَمْ مَا تَقُولُ.فَقَالَ عُرْوَةُ سَمِعْتُ بَشِيرَ بْنَ أَبِى مَسْعُودٍ يَقُولُ سَمِعْتُ أَبَا مَسْعُودٍ الأَنْصَارِىَّ يَقُولُ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « نَزَلَ جِبْرِيلُ -صلى الله عليه وسلم- فَأَخْبَرَنِى بِوَقْتِ الصَّلاَةِ فَصَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ثُمَّ صَلَّيْتُ مَعَهُ ». يَحْسُبُ بِأَصَابِعِهِ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فَرَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- صَلَّى الظُّهْرَ حِينَ تَزُولُ الشَّمْسُ وَرُبَّمَا أَخَّرَهَا حِينَ يَشْتَدُّ الْحَرُّ وَرَأَيْتُهُ يُصَلِّى الْعَصْرَ وَالشَّمْسُ مُرْتَفِعَةٌ بَيْضَاءُ قَبْلَ أَنْ تَدْخُلَهَا الصُّفْرَةُ فَيَنْصَرِفُ الرَّجُلُ مِنَ الصَّلاَةِ فَيَأْتِى ذَا الْحُلَيْفَةِ قَبْلَ غُرُوبِ الشَّمْسِ وَيُصَلِّى الْمَغْرِبَ حِينَ تَسْقُطُ الشَّمْسُ وَيُصَلِّى الْعِشَاءَ حِينَ يَسْوَدُّ الأُفُقُ وَرُبَّمَا أَخَّرَهَا حَتَّى يَجْتَمِعَ النَّاسُ وَصَلَّى الصُّبْحَ مَرَّةً بِغَلَسٍ ثُمَّ صَلَّى مَرَّةً أُخْرَى فَأَسْفَرَ بِهَا ثُمَّ كَانَتْ صَلاَتُهُ بَعْدَ ذَلِكَ التَّغْلِيسَ حَتَّى مَاتَ وَلَمْ يَعُدْ إِلَى أَنْ يُسْفر

আলোচ্য হাদীসটি আন্ডার লাইন করা অংশের অংশ বিশেষ। আর এই আন্ডার লাইন করা অংশ তথা ওয়াক্তের বিশদ বিবরণ সম্বলিত অংশটুকুকে ইমাম আবু দাউদ রাহ. মা‘লূল বা দোষযুক্ত সাব্যস্ত করেছেন। কারণ, ইব্ন শিহাব যুহরীর শাগরেদদের মধ্য হতে এক উসামা ইব্ন যায়দ আল-লাইছী ব্যতীত আর কেউ এই অংশটুকু বর্ণনা করেন না। মা‘মার, ইমাম মালেক, সুফইয়ান ইব্ন উয়াইনাহ, শুআইব ইব্ন আবূ হামযাহ, লাইছ ইব্ন সা‘দসহ ইব্ন শিহাব যুহ্রীর অন্যান্য হাফেজে হাদীস শাগরেদগণ এই অংশটুকু বর্ণনা করেন না। আবার উরওয়া হতে হিশাম ইব্ন উরওয়া ও হাবীব ইব্ন আবূ মারযূকও যুহরীর এই শাগরেদগণের অনুরূপ বর্ণনা করেন। তাঁরা সকলেই يحسب باصابعه خمس صلوات পর্যন্ত বর্ণনা করেন। পরবর্তী অংশটুকু তাঁদের কেউই বর্ণনা করেন না। দেখুন, বুখারী ও মুসলিম রাহিমাহুমাল্লাহ তাঁদের গ্রন্থে হাদীসটি সন্নিবেশিত করেছেন কিন্তু তাঁদের কেউই এই অংশ সম্বলিত হাদীসটি গ্রহণ করেননি। তার কারণ, সম্ভবত এই ইল্লাত বা দোষ। ইমাম আবূ দাউদ রাহ.-এর মন্তব্যটি হুবহু তুলে ধরছি, দেখুন।

قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَرَوَى هَذَا الْحَدِيثَ عَنِ الزُّهْرِىِّ مَعْمَرٌ وَمَالِكٌ وَابْنُ عُيَيْنَةَ وَشُعَيْبُ بْنُ أَبِى حَمْزَةَ وَاللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ وَغَيْرُهُمْ لَمْ يَذْكُرُوا الْوَقْتَ الَّذِى صَلَّى فِيهِ وَلَمْ يُفَسِّرُوهُ وَكَذَلِكَ أَيْضًا رَوَاهُ هِشَامُ بْنُ عُرْوَةَ وَحَبِيبُ بْنُ أَبِى مَرْزُوقٍ عَنْ عُرْوَةَ نَحْوَ رِوَايَةِ مَعْمَرٍ وَأَصْحَابِهِ

অতএব বোঝা গেল, আলোচ্য হাদীসটি উসামা ইবন যায়দ আল-লাইছীর শায বা দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। আর হাদীস সহীহ হওয়ার পথে দলবিচ্ছিন্নতা একটি বড় বাধা। যে সম্পর্কে পূর্বে আমি বিশদ আলোচনা করে এসেছি। কাজেই তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে দলীল হিসাবে এই হাদীসটিকে উপস্থাপন করা সঠিক বলে মনে করি না।

প্রসঙ্গত বলছি, লেখক হাদীসটির ثم صلى مرة اخرى فاسفر بها এই অংশের তরজমা করেছেন এইরূপ : ‘অতঃপর একবার পড়তে পড়তে ফর্সা করে দিয়েছিলেন।’ তরজমাটি ভুল বলে মনে হয়। অংশটির তরজমা এইরূপ হওয়া উচিত: অতঃপর আরেকবার তিনি সালাত আদায় করলেন, তো ফর্সা করে আদায় করলেন। লেখক এরপর লিখেছেন : উক্ত হাদীস প্রমাণ করে যে, একবার তিনি দীর্ঘ ক্বিরাআত করে ফর্সা করেছিলেন। যা সর্বাধিক উত্তম। এরপর থেকে অন্ধকার থাকতেই ছালাত শেষ করতেন।

বিস্ময়কর! যা সর্বাধিক উত্তম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা একবারমাত্র পালন করে সারাজীবন তা পরিহার করে গেলেন? হাঁ কোনো কারণে তা হতে পারে, কিন্তু কী সে কারণ? লেখক কেন তা উল্লেখ না করে এড়িয়ে গেলেন? এড়িয়ে গেলেন, না তার নিকট এ সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই নেই? আল্লাহই ভাল জানেন।

তাগলীস বিল ফাজরের পক্ষে লেখকের পেশকৃত দলীলসমূহের আলোচনার একটি পর্যায় এখানে শেষ হল।

 

পরবর্তী অংশসমূহ:
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৬
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৭
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৮
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৯
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-১০

1 Comment

  1. কথিত আহলে হাদীস ভাইদের অবস্থা খুবই আশংকাজনক। উনাদের এক শ্রেণী এতটাই অন্ধ…যে কী বলব! যদি একটুও হিদায়াতের তলব না থাকে তাহলে বড় মুশকিল। আমার মাঝেমধ্যেই একটি কথা মনে পড়ে খুবই চিন্তা লাগে! সেটা হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর একটি কথা। যার খোলাসা হল, যদি আল্লাহ্ তায়ালার কহর বা প্রচন্ড রাগ কারো উপর আপতিত হয় (আল্লাহ তায়ালার পানাহ!) তাহলে (তার এক আলামত হল) সে বাতিলকে হক ও হককে বাতিল মনে করতে থাকে। আমি এই গায়রে মুক্কাল্লিদ কাউকে কাউকে দেখেছি, বেচারাদের অবস্থা অত্যন্ত আশংকাজনকই জনক। যেভাবে তার সলফে সালেহীন ও উলামায়েকেরামকে তুচ্ছ তাচ্ছ্যিল্য করে ও নস্-এর অপব্যাখ্যা করে….কি বলব! আল্লাহ তায়ালা আমাদের ও পুরো উম্মাহকে হিফাযত করুন। আমীন।

    Reply

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE