সাহাবীদের মধ্যেও মাযহাব ছিল

ইলমে দ্বীনের ফুরূয়ী মাসাইল বা শাখাগত বিষয়ে মুজতাহিদ ইমামগণের যে মতপার্থক্য, যাকে ফিকহী মাযহাবের মতপার্থক্য বলে, তা দ্বীনের বিষয়ে বিচ্ছিন্নতা নয়।  ফিকহের এই মাযহাবগুলো তো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর ইমামগণেরই মাযহাব। এগুলো ‘বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং গন্তব্যে পৌঁছার একাধিক পথ, যা স্বয়ং গন্তব্যের মালিকের পক্ষ হতে স্বীকৃত ও অনুমোদিত। ফির্কা ও ফিকহী মাযহাবের পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হওয়া খুবই দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।
সাহাবায়ে কেরামের যুগেও ফিকহের মাযহাব ও ফিকহের মতপার্থক্য ছিল, অথচ তাঁরা খেয়ালখুশির মতভেদ কখনো সহ্য করতেন না। তাদের কাছে এ জাতীয় মতভেদকারীদের উপাধি ছিল ‘আহলুল আহওয়া’, ‘আহলুল বিদা ওয়াদ দ্বলালাহ’ এবং ‘আহলুল বিদআতি ওয়াল ফুরকা’। সাহাবায়ে কেরামের যুগের ফিকহের মাযহাব সম্পর্কে ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রাহ.-এর বিবরণ শুনুন :
১. ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. (১৬১ হি.-২৩৪ হি.) ইমাম বুখারী রাহ.-এর শ্রেষ্ঠ উস্তাদ ছিলেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামের সেসব ফকীহের কথা আলোচনা করেছেন, যাদের শাগরিদগণ তাঁদের মত ও সিদ্ধান্তগুলো সংরক্ষণ করেছেন, তা প্রচার প্রসার করেছেন এবং যাদের মাযহাব ও তরীকার উপর আমল ও ফতওয়া জারি ছিল। আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. এই প্রসঙ্গে বলেছেন, সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে এমন ব্যক্তি ছিলেন
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. (মৃত্যু : ৩২ হিজরী),
যাইদ ইবনে ছাবিত রা. (জন্ম : হিজরতপূর্ব ১১ ও মৃত্যু : ৪৫ হিজরী) ও
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. (জন্ম : হিজরতপূর্ব ৩ ও মৃত্যু : ৬৮ হিজরী)।
তাঁর আরবী বাক্যটি নিম্নরূপ:-
ولم يكن في أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم من له صُحَيْبَةٌ، يذهبون مذهبه، ويفتون بفتواه ويسلكون طريقته، إلا ثلاثة عبد الله بن مسعود وزيد بن ثابت وعبد الله بن عباس رضي الله عنهم، فإن لكل منهم أصحابا يقومون بقوله ويفتون الناس.
এরপর আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. তাঁদের প্রত্যেকের মাযহাবের অনুসারী ও তাঁদের মাযহাব মোতাবেক ফতওয়া দানকারী ফকীহ তাবেয়ীগণের নাম উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর যে শাগরিদগণ তাঁর কিরাত অনুযায়ী মানুষকে কুরআন শেখাতেন, তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মানুষকে ফতওয়া দিতেন এবং তাঁর মাযহাব অনুসরণ করতেন তারা হলেন নিন্মোক্ত ছয়জন মনীষী।
আলকামাহ (মৃত্যু : ৬২ হিজরী), আসওয়াদ (মৃত্যু : ৭৫ হিজরী), মাসরূক (মৃত্যু : ৬২ হিজরী), আবীদাহ (মৃত্যু : ৭২ হিজরী), আমর ইবনে শারাহবীল (মৃত্যু : ৬৩ হিজরী) ও হারিস ইবনে কাইস (মৃত্যু : ৩৬ হিজরী)।
ইবনুল মাদীনী রাহ. বলেছেন, ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. (৪৬-৯৬ হিজরী) এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করেছেন।
ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রাহ.-এর উপরোক্ত বিবরণের সংশ্লিষ্ট আরবী পাঠ নিম্নেরূপ
الذين يقرؤن الناس بقراءته ويفتونهم بقوله وبذهبون مذهبه …
এরপর আলী ইবনুল মাদীনী রাহ. লিখেছেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর (ফকীহ) শাগরিদদের সম্পর্কে এবং তাঁদের মাযহাবের বিষয়ে সবচেয়ে বিজ্ঞ ছিলেন ইবরাহীম (নাখায়ী) (৪৬-৯৬ হিজরী) ও আমের ইবনে শারাহীল শাবী (১৯-১০৩ হিজরী)। তবে শাবী মাসরূক রাহ.-এর মাযহাব অনুসরণ করতেন।
আরবী পাঠ নিম্নেরূপ
وكان أعلم أهل الكوفة بأصحاب عبد الله ومذهبهم إبراهيم والشعبي إلا أن الشعبي كان يذهب مذهب مسروق.
এরপর লিখেছেন-
وكان أصحاب زيد بن ثابت الذين يذهبون مذهبه في الفقه ويقومون بقوله هؤلاء الاثنى عشر …
অর্থাৎ যাইদ ইবনে ছাবিত রা.-এর যে শাগরিদগণ তাঁর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং তাঁর মত ও সিদ্ধান্তসমূহ সংরক্ষণ ও প্রচার প্রসারে মগ্ন ছিলেন তাঁরা বারো জন।
তাদের নাম উল্লেখ করার পর ইবনুল মাদীনী রাহ. লেখেন, এই বারো মনীষী ও তাদের মাযহাবের বিষয়ে সবচেয়ে বিজ্ঞ ছিলেন ইবনে শিহাব যুহরী (৫৮-১২৪ হিজরী), ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আনসারী (মৃত্যু : ১৪৩ হিজরী), আবুয যিনাদ (৬৫-১৩১ হিজরী),আবু বকর ইবনে হাযম (মৃত্যু ১২০ হিজরী)।
এদের পরে ইমাম মালেক ইবনে আনাস রাহ. (৯৩-১৭৯ হিজরী)।
এরপর ইবনুল মাদীনী রাহ. বলেছেন-
وكما أن أصحاب ابن عباس ستة الذين يقومون بقوله ويفتون به ويذهبون مذهبه.

তদ্রুপ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর যে শাগরিদগণ তার মত ও সিদ্ধান্তসমূহ সংরক্ষণ ও প্রচারে মগ্ন ছিলেন, সে অনুযায়ী ফতওয়া দিতেন এবং তার অনুসরণ করতেন, তাঁরা ছয়জন।
এরপর তিনি তঁদের নাম উল্লেখ করেন।
ইমাম ইবনুল মাদীনী রাহ.-এর পূর্ণ আলোচনা তাঁর ‘কিতাবুল ইলালে’ (পৃষ্ঠা : ১০৭-১৩৫, প্রকাশ : দারুবনিল জাওযী রিয়ায, ১৪৩০ হিজরী।) বিদ্যমান আছে এবং ইমাম বাইহাকী রাহ.-এর ‘আলমাদখাল ইলাস সুনানিল কুবরা’তেও (পৃষ্ঠা : ১৬৪-১৬৫) সনদসহ উল্লেখিত হয়েছে। আমি উক্তিটি দুইটি কিতাব সামনে রেখেই উদ্ধৃত করছি। এই কথাগুলো আলোচ্য বিষয়ে এতই স্পষ্ট যে, এখানে আর কোনো টীকা-টিপ্পনীর প্রয়োজন নেই।

সুতরাং মনে রাখতে হবে, ইমামগণের ফিকহী মাযহাবের যে মতপার্থক্য তাকে বিভেদ মনে করা অন্যায় ও বাস্তবতার বিকৃতি এবং সাহাবায়ে কেরামের নীতি ও ইজমার বিরোধিতা। আর এ মতপার্থক্যের বাহানায় মাযহাব অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে তাদের নিন্দা-সমালোচনা করা সরাসরি বিচ্ছিন্নতা, যা দ্বীনের বিষয়ে বিভেদের অন্তর্ভুক্ত।
তেমনি মাযহাবের অনুসারী কোনো ব্যক্তি বা দল যদি মাযহাবকে জাহেলী আসাবিয়াত ও দলাদলির কারণ বানায় তাহলে তার/তাদের এই কাজও নিঃসন্দেহে ঐক্যের পরিপন্থী এবং বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার শামিল।

দেখুন, ‘মুহাজিরীন’ ও ‘আনসার’ কত সুন্দর দুটি নাম এবং কত মর্যাদাবান দুটি জামাত। উভয় জামাতের প্রশংসা কুরআন মজীদে রয়েছে। কিন্তু এক ঘটনায় যখন এ দুই নামের ভুল ব্যবহার হয়েছে তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে তাম্বীহ করেছেন।

জাবির রা. থেকে বর্ণিত, এক সফরে এক মুহাজির তরুণ ও এক আনসারী তরুণের মাঝে কোনো বিষয়ে ঝগড়া হয়। মুহাজির আনসারীকে একটি আঘাত করল। তখন আনসারী ডাক দিল, يا للأنصار! হে আনসারীরা!; মুহাজির তরুণও ডাক দিল- يا للمهاجرين হে মুহাজিররা!; আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আওয়াজ শোনামাত্র বললেনÑما بال دعو- جاهلية এ কেমন জাহেলী ডাক! কী হয়েছে? ঘটনা বলা হল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এমন জাহেলী ডাক ত্যাগ কর। এ তো দুর্গন্ধযুক্ত ডাক!

অন্য বর্ণনায় আছে, এতে তো বিশেষ কিছু ছিল না। (কেউ যদি কারো উপর জুলুম করে তাহলে) সকলের কর্তব্য, তার ভাইয়ের সাহায্য করা। সে জুলুম করুক বা তার উপর জুলুম করা হোক। জালিম হলে তাকে বাধা দিবে। এটাই তার সাহায্য। আর মাজলুম হলে তার সাহায্য করবে (জুলুম থেকে রক্ষা করবে)।- (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৪৯০৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৫৮৪/৬২, ৬৩)
হাদীসের অর্থ হচ্ছে, কারো উপর জুলুম হতে থাকলে সাহায্যের জন্য ডাকতে বাধা নেই। কিন্তু ডাকবে সব মুসলমানকে। যেমন উপরোক্ত ঘটনায় আনসারী মুহাজিরদেরকেও ডাকতে পারতেন এবং মুহাজির আনসারীদেরকে ডাকতে পারতেন। কিংবা ভাইসব! মুসলমান ভাইরা! বলেও ডাকা যেত। কিন্তু এমন কোনো ডাক মুসলমানের জন্য শোভন নয়, যা থেকে আসাবিয়ত ও দলাদলির দুর্গন্ধ আসে। কারণ তা ছিল জাহেলী যুগের প্রবণতা। ঐ সময় সাহায্য ও সমর্থনের ভিত্তি ছিল বংশীয় বা গোত্রীয় পরিচয়। ইসলামে সাহায্যের ভিত্তি হচ্ছে ন্যায় ও ইনসাফ।
وتعاونوا على البر والتقوى، ولا تعاونوا على الإثم والعدوان
এ কারণে ইসলামের নিয়ম, জালিমকে আটকাও সে যেই হোক না কেন। তোমার দলের বা তোমার বংশেরই হোক না কেন
হাদীসে আছে-
ليس منا من دعا إلى عصبية، وليس منا من قاتل عصبية، وليس منا من مات
على عصبية
‘ঐ ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আসাবিয়তের দিকে ডাকে, সেও আমাদের দলভুক্ত নয়, যে আসাবিয়তের কারণে লড়াই করে এবং সে-ও নয়, যে আসাবিয়তের উপর মৃত্যুবরণ করে।’- (আবু দাউদ, হাদীস : ৫১২১)
অন্য হাদীসে আছে-
يا رسول الله! ما العصبية؟ قال : أن تعين قومك على ظلم.
‘আল্লাহর রাসূল! আসাবিয়ত কী?  বললেন, নিজের কওমকে তার অন্যায়-অবিচারের বিষয়ে সাহায্য করা।’- (আবু দাউদ, হাদীস : ৫১১৯)

তো ঘটনাটি এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য এই যে, ‘মুহাজির’ ও ‘আনসার’ দুটি আলাদা নাম, আলাদা জামাত, আলাদা পরিচয়- এতে আপত্তির কিছু নেই। আপত্তি তখনই হয়েছে যখন নাম দুটি এমনভাবে ব্যবহার করা হল, যা থেকে আসাবিয়তের দুর্গন্ধ আসে। এ শিক্ষা ফিকহি মাযহাবের ভিত্তিতে আলাদা জামাত ও আলাদা পরিচয় কিংবা অন্য কোনো বৈধ বা প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণী ও পরিচয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ নীতি সব ক্ষেত্রেই মনে রাখা উচিত। অর্থাৎ এ ধরনের বিভিন্নতায় কোনো অসুবিধা নেই, যদি তাকে বিভিন্নতার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়। বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা পর্যন্ত না নেওয়া হয়; একে মুয়ালাত ও মুআদাত তথা বন্ধুত্ব ও শত্র“তার মানদণ্ড এবং আসাবিয়াতের কারণ না বানানো হয়। উপরের হাদীস থেকে আসাবিয়াতের অর্থও পরিষ্কার হয়ে গেছে। তা এই যে, কোনো ব্যক্তি বা মত কিংবা কোনো গোত্র বা দলের শুধু এজন্য সমর্থন করা যে, তারা আমার আপন। চাই তারা হকের উপর থাকুক অথবা বাতিলের উপর, সঠিক বলুক অথবা ভুল! অথচ ইসলামে সমর্থনের ভিত্তি হচ্ছে দলিল ও ইনসাফ। জুলমের ক্ষেত্রে কারো সহযোগিতা করা হারাম সে যতই আপন হোক না কেন
তেমনি দলিলের বিপরীতে কোনো মত বা মাযহাবের সমর্থন করা হারাম। কারণ দলিলহীন বিয়ষেরই যখন কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই তখন দলিল বিরোধী বিষয়ের কথা তো বলাই বাহুল্য।
আমি আরজ করছিলাম, ফুরূয়ী ইখতিলাফকে দ্বীনের বিষয়ে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার মধ্যে দাখিল করা এবং ফিকহী মাযহাবের অনুসরণকে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা সাব্যস্ত করা জায়েয নয়।
শরীয়তের রীতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে যাদের সঠিক ধারণা নেই তারা ইখতিলাফ শব্দটি শোনামাত্রই ভ্র-কুঞ্চিত করেন এবং কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়েন, বিশেষত নামাযের মতো মৌলিক ইবাদতের বিষয়ে ইখতিলাফ, যা ঈমানের পর ইসলামের সবচেয়ে বড় রোকন, তাদের পক্ষে একেবারেই যেন অসহনীয়!
তাদের জানা থাকা উচিত, ইখতিলাফমাত্রই পরিত্যাজ্য নয়। কেননা কিছু ইখতিলাফ বা মতভেদ আছে, যার প্রেরণা দলীলের অনুসরণ। স্বয়ং দলীলই ওই মতভেদের উৎস। আর কিছু মতভেদ আছে, যা সৃষ্টি হয় মূর্খতা ও হঠকারিতার কারণে। দলীল সম্পর্কে অজ্ঞতা কিংবা দলীলের শাসন মানতে অস্বীকৃতিই এই মতভেদের উৎস। প্রথম ইখতিলাফ বা মতভেদ শরীয়তে স্বীকৃত আর দ্বিতীয়টা নিন্দিত।
বিষয়গত দিক থেকে ঈমানিয়াত ও আকাইদ অর্থাৎ ইসলামের সকল মৌলিক আকীদা এবং শরীয়তের সকল অকাট্য মাসআলা ঐ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত যেখানে দলীলভিত্তিক কোনো ইখতিলাফ-মতভেদ হতেই পারে না। এজন্য দেখবেন, এসব বিষয়ে দ্বীনের ইমামগণের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই। এক্ষেত্রে কেউ মতভেদ করলে তা অবশ্যই হঠকারিতা। আর ওই মতভেদকারী হয় মুবতাদি (বিদআতী) কিংবা মুলহিদ (বেদ্বীন)। কিন্তু ফুরূয়ী মাসাইল, এতেও শ্রেণীভেদ রয়েছে, এর ধরন ভিন্ন। এখানে দলীলভিত্তিক মতভেদ হতে পারে এবং হয়েছে। শরীয়তে এটা স্বীকৃত এবং শরীয়তই একে বহাল রেখেছে।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ, খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ এবং সাহাবা ও তাবেয়ীন যুগেও এটা ছিল এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে।
এই মতভেদের বিষয়ে শরীয়তের বিধান হল তা বিলুপ্ত করার চেষ্টা ভুল এবং একে বিবাদ-বিসংবাদের মাধ্যম বানানো অপরাধ। দলীলভিত্তিক মতভেদ স্বীকৃত; বরং নন্দিত, কিন্তু বিবাদ-বিসংবাদ হারাম ও নিষিদ্ধ।
এই শ্রেণীর ফুরূয়ী ইখতিলাফ (শাখাগত বিষয়ে মতভেদ) প্রকৃতপক্ষে গন্তব্যে পৌঁছার একাধিক পথ। সিরাতে মুস্তাকীমেরই বিভিন্ন পথরেখা। এগুলোর কোনোটাকেই প্রত্যাখ্যান করা কিংবা অনুসরণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ। এটা ইলাহী নীতির বিরোধী, যা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যবান মুবারকে উচ্চারিত হয়েছে-
كلاكما محسن فاقرءا
‘দুজনই সঠিক, অতএব পড়তে থাক।’ (সহীহ বুখারী হাদীস : ৫০৬২)
এবং তার কর্ম দ্বারা প্রকাশিত হয়েছে-
فما عنَّفَ واحدا من الفريقين
‘অতঃপর কোনো দলকেই তিনি ভর্ৎসনা করলেন না।’
এ ধরনের আরো বহু দলীলে যা উল্লেখিত হয়েছে।

কেউ যদি প্রশ্ন করেন যে, এই মতভেদ বহাল রাখার তাৎপর্য কী, তাহলে এর সুনিশ্চিত ও বিস্তারিত উত্তর তো আখিরাতেই আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে জানা যেতে পারে-
কেন তিনি দ্বীনের সকল বিষয় এক পর্যায়ের দলীল قطعيُّ الثُّبُوت وقطعيُّ الدَّلَالة -এর মাধ্যমে দিলেন না, তাহলে তো বাস্তব/যৌক্তিক মতভিন্নতার সুযোগই থাকত না। আর ফিকহী যেসব মাসআলায় মতভিন্নতা দেখা যায় সেসব ক্ষেত্রেও তখন আমরা বলে দিতে পারতাম যে, বাইয়্যিনাত থাকার পর তো কোনো মতভিন্নতা বৈধ নয়! আখিরাতেই বিস্তারিত জানা যাবে যে, আল্লাহ তাআলা অভিন্ন গন্তব্যের জন্য বিভিন্ন পথ কেন নির্দেশ করলেন, সিরাতে মুস্তাকীমে বিচিত্র পথ-রেখার সমাবেশ কেন ঘটালেন। তিনি কি ইচ্ছা করলে ফুরূয়ের মধ্যেও সিরাতে মুস্তাকীমের একটিমাত্র ধারাই জারি করতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। যেমন করেছেন মৌলিক আকায়েদ ও জরুরিয়াতে দ্বীনের ক্ষেত্রে। কিন্তু এখানে রয়েছে প্রজ্ঞার অতল গভীরতা, যার সবটা জেনে ফেলার আকাঙ্খাই হাস্যকর। তবে যতটুকু তিনি বান্দাদের সামনে প্রকাশ করেছেন তা-ও প্রশান্তির জন্য যথেষ্ট। যারা এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে ইচ্ছুক তারা ‘আসবাবুল ইখতিলাফ’ ও ‘আদাবুল ইখতিলাফ’ বিষয়ে বিশদ ও গ্রহণযোগ্য কিতাবপত্র অধ্যয়ন করতে পারেন।
মনে রাখা দরকার, যে মতভেদের ভিত্তি দলীলের উপর নয়; মূর্খতা, হঠকারিতা এবং ধারণা ও সংশয়ের উপর, তা আপাদমস্তক নিন্দিত। দ্বীনের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়াদি এবং অকাট্য ও ইজমায়ী মাসআলাগুলোতে দ্বিমত প্রকাশ এই নিন্দিত মতভেদেরই অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে এটা ‘মতভেদ’ নয়, ‘দলীলের বিরোধিতা’; ‘ইখতিলাফ’ নয় ‘মুখালাফাত’। এই বিরোধী ব্যক্তি সিরাতে মুসতাকীম থেকে বিচ্যুত। তার গন্তব্য ও ন্যায়নিষ্ঠ মুমিনের গন্তব্য এক নয়। সে তো এক ভিন্ন লক্ষ্যের অভিযাত্রী, যার পরিচয় হল-
مَنْ شَذَّ شّذَّ في النار
বলাবাহুল্য, সিরাতে মুসতাকীমের অর্ন্তগত বিভিন্ন পথ এবং সিরাতে মুসতাকীম থেকে বিচ্যুত বিভিন্ন পথের হুকুম এক নয়। প্রথম ক্ষেত্রে পথরেখা বাহ্যত বিভিন্ন হলেও প্রকৃত পক্ষে তা একই পথের অন্তর্গত। আর লক্ষ্য ও মঞ্জিল যে অভিন্ন তা তো বলাই বাহুল্য। আর শেষোক্ত ক্ষেত্রে পথও ভিন্ন, লক্ষ্যও ভিন্ন। প্রথম ক্ষেত্রে পথগুলো নিরাপদ ও স্বীকৃত আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিপদসঙ্কুল ও পরিত্যাক্ত।
এ কারণে সিরাতে মুসতাকীমের উপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর ইমাম ও আলিমদের মাঝে ফুরূয়ী মতপার্থক্য হলেও বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার কোনো আলামত প্রকাশিত হয়নি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ ও সাহাবায়ে কেরামের তরীকাকে বিভেদ ও বিদআত থেকে বাঁচার মানদণ্ড বলেছেন, অথচ ফুরূয়ী মাসআলায় তাঁদের মাঝেও মতপার্থক্য হয়েছে।
কিন্তু এ কারণে বিভেদ হয়নি এবং প্রীতি ও সম্প্রীতি নষ্ট হয়নি। তাঁদের দিল অভিন্ন ছিল। ঐ ইখতিলাফ তাঁদের ইজতিমায়ী যিন্দেগীতে কোনো প্রকারের অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারেনি। তো বোঝা গেল, দলিল ও ইজতিহাদভিত্তিক এই মতপার্থক্য বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা নয়। হ্যাঁ, কেউ যদি ঐ ফুরূয়ী ইখতিলাফকে বিভেদের কারণ বানায় তাহলে সেটা তার অজ্ঞতা, যা সংশোধন করা ফরয।
আবু আবদুল্লাহ আলউকবুরী রাহ. ( ৩৮৭ হি.) ‘আলইবানা’য় (খ- : ১, পৃষ্ঠা : ২০৫-২১১) এবং আবুল মুযাফফর আসসামআনী রাহ. (৪৮৯ হি.) ‘আলইনতিসার লিআহলিল হাদীস’ কিতাবে এ বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। আবুল মুযাফফরের বক্তব্য আবুল কাসিম আততাইমী রাহ.ও (৫৩৫ হি.) ‘আলহুজ্জা ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ’ ও ‘শরহু আকীদাতি আহলিস সুন্নাহ’য় (খ- : ২, পৃষ্ঠা : ২৩৭-২৪৪) নকল করেছেন।
আবুল মুযাফফরের বক্তব্যের কিছু অংশ নকল করছি :
وبهذا يظهر مفارقة الاختلاف في مذاهب الفروع اختلاف العقائد في الأصول، فإنا وجدنا أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم ورضي الله عنهم اختلفوا في أحكام الدين فلم يفترقوا ولم يصيروا شيعا، لأنهم لم يفارقوا الدين، ونظروا فيما أذن لهم فاختلفت أقوالهم وآرائهم في مسائل كثيرة …
فصاروا باختلافهم في هذه الأشياء محمودين، وكان هذا النوع من الاختلاف رحمة من الله لهذه الأمة، حيث أيدهم باليقين، ثم وسع على العلماء النظر فيما لم يجدوا حكمه في التنزيل والسنة، فكانوا مع هذا الاختلاف أهل مودة ونصح، وبقيت بينهم أخوة الإسلام، ولم يقطع عنهم نظام الألفة.
فلما حدثت هذه الأهواء المردية الداعية صاحبها إلى النار ظهرت العداوة وتباينوا (أي المبتدعين أصحاب الأهواء) وصاروا أحزابا، فانقطعت الأخوة في الدين وسقطت الألفة،
فهذا يدل على أن هذا التباين والفرقة إنما حدثت من المسائل المحدثة … إلى آخر ما قال فأجاد وأفاد.

উপরিউক্ত আলোচনার  সারকথা এই যে,
ইখতিলাফে মাযমূম (নিন্দিত ইখতিলাফ) তো গোড়া থেকেই বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার শামিল। এই বিচ্ছিন্নতার পর যতই ঐক্যের প্রদর্শনী করা হোক এবং প্রীতি ও সম্প্রীতির আহ্বান জানানো হোক কিংবা বাস্তবেও তা করা হোক সর্বাবস্থায় তা বিচ্ছিন্নতা। প্রীতি ও সম্প্রীতির দ্বারা দ্বীনের ক্ষেত্রে বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার খারাবি দূর হয় না; বরং আরো বেড়ে যায়। পক্ষান্তরে ইখতিলাফে মাহমূদ (নন্দিত ইখতিলাফ) বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা নয়, কিন্তু যে তাকে বিভেদের কারণ বানায় সে নিজে বিচ্ছিন্নতার শিকার। তার উপর ফরয, ইখতিলাফের নীতি ও বিধান সম্পর্কে জানা এবং সকল ইখতিলাফকে স্ব স্ব পর্যায়ে রাখা।
নন্দিত ইখতিলাফ বিভেদ-বিচ্ছিন্নতা যেভাবে হয়-

১. দলিল দ্বারা প্রমাণিত অন্য মত বা পদ্ধতিকে অস্বীকার করা।
২. দ্বিতীয় মত বা পদ্ধতির অনুসারীদের সম্পর্কে কটুক্তি করা। তাদেরকে হাদীস বিরোধী ও সুন্নাহ বিরোধী আখ্যা দেওয়া, বিদআতী বা গোমরাহ বলা …
৩. দ্বিতীয় মত বা পদ্ধতি অনুসরণে বাধা দেওয়া কিংবা অনুসারীর জান-মাল, ইজ্জত-আব্র“র উপর আক্রমণ করা, তাকে শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া।
৪. দ্বিতীয় মত ও পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনার সময় ঐ মত ও পদ্ধতি বা তার দলিল বর্ণনার ক্ষেত্রে ইলমী খিয়ানত করা বা কোনো ধরনের না-ইনসাফী করা।
৫. এই ইখতিলাফের কারণে মানবীয় হকসমূহ এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের হকসমূহ রক্ষা না করা, যার কিছু আলোচনা ভূমিকায় পৃ. ২২-২৬ এসেছে।
৬. এই ইখতিলাফের কারণে দ্বীনের সম্মিলিত কাজসমূহে একে অপরের সাহায্য করা থেকে বিরত থাকা।
৭. এই ইখতিলাফের কারণে পরস্পর সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।
৮. এইসব বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়ে উম্মতের সামষ্টিক সমস্যা থেকে গাফেল হয়ে যাওয়া এবং জরুরিয়াতে দ্বীন ও শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহের প্রচার-প্রতিষ্ঠায় উদাসীন হয়ে যাওয়া।
৯. নিজের মত ও মাযহাবের লোকদের ভুল-ভ্রান্তির প্রতিবাদ না করা এবং তাদের সংশোধনের বিষয়ে উদাসীন থাকা।
১০. অন্যান্য তরীকা ও মাযহাবের অনুসারীদের গুণাবলি অস্বীকার করা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ আরোপ করা।

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE