প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব-৩

পূর্বের অংশ সমূহ:
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -১
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -২

বর্তমানকালে সবকিছুই আর্ট বা শিল্পের মর্যাদা লাভ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা মানব-সত্তায় যে বহুমুখী প্রতিভা নিহিত রেখেছেন, নিত্য নতুন পন্থায় তা বিকাশ লাভ করছে। প্রতিভা-বিকাশের সে ডামাডোলে মানুষের কাছে লঘু-গুরুর প্রভেদও যেন ঘুচে গেছে। তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়কেও সে তার চর্চা ও পরিচর্যার স্পর্শে মনোযোগ-আকর্ষী শিল্পের স্তরে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। মানব-সংশ্লিষ্ট একটি বিষয়ও এখন আর শিল্পের আওতা-বহির্ভূত নয়। তা না-ই থাকুক। মানুষের হাতের ছোঁয়ায় নগণ্য সবকিছু প্রথম শ্রেণীতে গণ্য হয়ে উঠলে তাকে তো মানুষের কৃতিত্বই বলতে হবে। সুতরাং মানুষের জীবন সম্পর্কিত প্রতিটি জিনিস যদি শিল্প হয়ে ওঠে তা উঠুক না! আমরা তাকে সাধুবাদই জানাব। কেননা আমাদের শরীআত যে জীবনের নির্দেশনা দেয়, তাও তো শিল্পিত জীবনই। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাচার ছিল শিল্পোৎকর্ষের সর্বোত্তম নিদর্শন। তাঁর শিক্ষায় আমরা অপরিহার্য সব কিছুর নিখুঁত ধারণ ও বাহুল্য সবকিছু বর্জনেরই সবক পাই। সেই সবক যে গ্রহণ করবে তাঁর হাসি-কান্না, চলন-বলন প্রভৃতি জীবনকৃত্য সুষমাম–ত হতে বাধ্য। তার প্রতিটি বিষয় হবে সুচারু ও শোভনীয়। কাজেই সাধনা-সেবা ও চর্চা-পরিচর্যা দ্বারা কোনও কিছুকে শিল্পমানে উন্নীত করার ভেতর এমনিতে কোনও দোষ নেই। তা দোষের হয় তখনই, যখন তাতে বৈধাবৈধের কোন বিচার থাকে না, সত্যাসত্যের ভেদাভেদ থাকে না এবং পারিপার্শ্বিক লাভ-ক্ষতির প্রতি কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকে না। এই বেলাগাম লিপ্ততার কারণে অনেক সময় নন্দিত জিনিস নিন্দিত হয়ে যায় এবং বৈধ বিষয় অবৈধতায় পর্যবসিত হয়। যেই ‘প্রশংসা’ সম্পর্কে আমরা আলোচনা করছি, এমনিতে তো তা একটি বৈধ এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাম্য জিনিস। তাই পূর্ণ মনোযোগের সাথে এতে লিপ্ত হওয়াতে কোনও দোষ নেই। বরং যথার্থ প্রশংসাকে ভাব-ভঙ্গী ও ভাষার মাধুর্যে মনোজ্ঞ করে তুললে তা কেবল প্রশংসিতের মনোরঞ্জনই করে না, প্রশংসার লক্ষ্যার্জনেও সহায়ক হয়। কিন্তু তা সহায়ক হয় ততক্ষণই, যতক্ষণ প্রশংসাকে শিল্পিতকরণের বাড়াবাড়ি দ্বারা বাস্তবতাবর্জিত অতিকথনে পরিণত করা না হয়। সন্দেহ নেই আজকাল তাই হচ্ছে এবং ভয়াবহরূপে হচ্ছে। সাধারণ-বিশিষ্ট অধিকাংশের দ্বারাই এই অনুচিত কর্মটি ঘটছে। বিশেষত দৃষ্টি যাদের শৈল্পিক বর্ণচ্ছটায় প্রশংসাকে কতটা ঝলমলে করে তোলা যায় এবং প্রশংসিত বা শ্রোতা সাধারণকে প্রশংসার যাদুকাঠি দ্বারা কতটা মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলা যায়, সে দিকেই নিবদ্ধ, তাদের হাতে পড়ে প্রশংসা নামক সুকুমার কর্মটি আজ চরমভাবে বিপন্ন। ক্ষেত্রবিশেষে সেই বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করা খুব সহজ কাজ নয়।

লিখন, কথন, পারস্পরিক আলাপচারিতা, সভা-সমাবেশের বক্তৃতা-বিবৃতি, ও সবরকম গণমাধ্যমের প্রচার-প্রচারণায় ব্যক্তি বা বস্তুর গুণকীর্তন একটি নিত্যদিনের কর্মানুষ্ঠান। হরদম নানাপ্রকারে, বিচিত্র ভাব-ভঙ্গীতে এতে লিপ্ত হরেক রকম মানুষ। এর বিবিধ কার্যপ্রণালীর ফিরিস্তি দান করা এ স্থলে উদ্দেশ্য নয় এবং তা সম্ভবও নয়। কেবল মোটা দাগের কয়েকটি রসমী ও পেশাগত পদ্ধতির উল্লেখ করা যাচ্ছে, যাতে ব্যক্তি বা বস্তুর প্রশংসা শুধু উচ্ছ্বসিতভাবেই নয়; কোনওরকম সত্যাসত্যের তোয়াক্কা না করে যথেচ্ছভাবে করা হচ্ছে।

  সংবর্ধনা ও মানপত্র

গুণী ব্যক্তিকে সংবর্ধনা দেওয়ার রেওয়াজ বহুদিনের। বর্তমানে এর ব্যাপকতা অনেক বেশি। এখন সংবর্ধিত হওয়ার জন্য গুণী হওয়ার দরকার পড়ে না। অর্থ ক্ষমতাও সংবর্ধনাকে আকর্ষণ করে। গুণ অপেক্ষা একটু বেশি পরিমাণেই করে। কারণ এর সাথে প্রভাব-প্রতিপত্তি জড়িত। সংবর্ধনা যেন প্রভাবশালীর হক। তাই এ হক আদায়ে প্রভাববলয়ের সকলে থাকে বেজায় ব্যস্ত, তা অন্যসব হক অর্থাৎ শরী‘আত-নির্ধারিত হক আদায়ে যতই নির্লিপ্ত থাকুক না কেন।

যা-হোক সংবর্ধনা সাভায় উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে মানপত্র দেওয়া হয় এবং বক্তাগণ তার গুণকীর্তনে একের পর এক বক্তৃতা দিতে থাকে। তাতে যা লেখা বা বলা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সাথে তার কোন সম্পর্ক থাকে না। মানপত্রের রচয়িতা ও বক্তা প্রত্যেকেরই নজর থাকে নিজ দক্ষতা জাহির করার দিকে। সেইসঙ্গে উদ্দেশ্য থাকে খোশামোদ করাও। তাই যা বলা হচ্ছে তা আদৌ সত্য কি না বা তার সাথে সেই ব্যক্তির দূরেরও কোন সম্পর্ক আছে কি না তা ভেবে দেখার কোনও প্রয়োজনই বোধ করা হয় না। ফলে লিখিত ও উচ্চারিত সবটাই হয় কুরআন মাজীদের ভাষায় زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُوْرًا ‘প্রতারণামূলক চমকপ্রদ বাক্য’ (আনআম : ১১২)।
ব্যক্তিটির মধ্যে যদি কিছুটাও আত্মসচেতনতা থাকে এবং থাকে আল্লাহর ভয়, তবে সেসব বাক্যের অসারতা ঠিকই বুঝতে পারে। যদ্দরুন সে কুণ্ঠিত ও বিব্রত হয়। ভেবে শিউরে ওঠে যে, আমি কী আর বলা হচ্ছে কী!

এমনকি অনেক সময় তজ্জন্য নিজেকে অপমানিতও বোধ করে। কেননা ব্যক্তির সাথে প্রশংসাবাক্যের তফাত দৃষ্টিকটু রকমের হলে তা আর প্রশংসা থাকে না, ব্যঙ্গে পরিণত হয়ে যায়। ভরা-মজলিসে ব্যঙ্গ-উপহাসের শিকার হলে আত্মম্মানবোধসম্পন্ন যে-কোনও লোকই নিজেকে অপমানিত বোধ করবে। কী লোমহর্ষক পরিহাস! সম্মাননার শিরোনামে এতসব আয়োজন, অথচ বাস্তবে হচ্ছে চরম অবমাননা। কিন্তু আয়োজকের সে অনুভূতি কোথায়? ব্যঙ্গাত্মক বাক্যবাণে একজনকে জর্জরিত করা হচ্ছে, অথচ তারা এই ভেবে আহ্লাদ বোধ করছে যে, কি অভূতপূর্ব সম্মাননা তাকে দান করলাম! এটা একরকম আত্মপ্রবঞ্চনাও বটে। চরম গর্হিত কাজ করে ভাবা হচ্ছে বেজায় ভালো কাজ। তবে এ জাতীয় অতিরঞ্জনে যারা খুশি না হয়ে লজ্জিত ও কুণ্ঠিত হয় কিংবা অপমানিত বোধ করে তাদের সংখ্যা বড় কম। দ্বীনদারী ও আল্লাহভীতির অভাবে মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতি হারিয়ে যায়। অর্থ ও সম্মানস্পৃহা মানুষকে স্থূলমতি করে তোলে। জড়বাদ-অধ্যুষিত আধুনিক বিশ্ব তো সেই স্পৃহায় কাতর। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই এখন স্তবপ্রত্যাশী। তাতে যত অত্যুক্তিই হোক না কেন, তাকে তারা অসংগত মনে করে না। বরং খুশিই হয় এবং মনে মনে স্তবককে বাহবা দেয়। এতে প্রশংসাকারী ও প্রশংসিত ব্যক্তির যে ক্ষতি হয় সে সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা হয়েছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এজাতীয় সংবর্ধনার পেছনে উদ্দেশ্য খুব সৎ থাকে না। লক্ষ থাকে টাকা-পয়সা বা অন্যায় সুযোগ-সুবিধা। এভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে কারও থেকে অন্যায় সুবিধা ভোগের কোনও বৈধতা ইসলামে নেই।

এক হাদীসে ইরশাদ-

إن الله يبغض البليغ من الرجال الذي يتخلل بلسانه تخلل الباقرة بلسانها
আল্লাহ তাআলা সেই বাগ্মী পুরুষকে ঘৃণা করেন, যে তার জিহবা (অর্থাৎ বাকচাতুর্য) দ্বারা খায় (অর্থাৎ রোজগার করে), যেমন গরু তার জিহবা দ্বারা খেয়ে থাকে
(সুনানে আবূ দাঊদ, হাদীস ৫০০৫; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৮৫৩)।

এ হাদীস মুখের যে কোনও অপব্যবহার দ্বারা পার্থিব সুবিধা ভোগকে অবৈধ ঘোষণা করছে। অনস্বীকার্য, প্রশংসার বাড়াবাড়িও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং সংবর্ধনা ও মানপত্র দানের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে কোনও রকম অসদুদ্দেশ্যকে এতে প্রশ্রয় দেওয়া না হয়। উদ্দেশ্য সৎ থাকার পরও অসত্য কথন ও অতিরঞ্জনকে পরিহার করতে হবে। সেই সঙ্গে সঠিক প্রশংসা বাক্যও যদি কারও পক্ষে ক্ষতিকর মনে হয় তাও পরিত্যাজ্য।

  চরিত্রসনদ

সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চরিত্রসনদকে মূল্য দেওয়া হয়। তাছাড়াও সামাজিক বিভিন্ন কাজে এর প্রয়োজন পড়ে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ এ সনদ দিয়ে থাকেন এবং তাদের দেওয়া সনদ অনুযায়ী সনদবাহী ব্যক্তিকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সুতরাং এটা একটা দায়িত্বপূর্ণ কাজ। একাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা কতটুকু দেওয়া হয়? পরিচিত-অপরিচিত যে কেউ আসে, লিখে দেওয়া ‘সে আমার পরিচিত। সে দেশের একজন সুনাগরিক ও চরিত্রবান লোক।’ ক্ষেত্রবিশেষে আরও অনেক কিছু লেখা হয় ও উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। অপরিচিত লোককেও যদি পরিচিত বলে চালানো হয় তাতে সনদদাতার সত্যনিষ্ঠা অক্ষুণ্ণ থাকে কি? তারপর যদি কারও সম্পর্কে বেশি কিছু না বলে কেবল এতটুকুই বলা হয় যে, ‘সে একজন সুনাগরিক ও চরিত্রবান লোক’ প্রশংসা হিসেবে তা কি কম কিছু? দেশের জন্য কারও সুনাগরিক হওয়াটা তো চারটিখানি কথা নয়। এর জন্য যে দায়বদ্ধতা ও কল্যাণচিমত্মার দরকার তা ঠিক কতখানি আমাদের মধ্যে আছে? দেশ ও দেশাত্মবোধের জিগির তো সবার মুখে মুখে, কিন্তু দেশের জন্য সত্যিকারের মমতা কতজন পোষণ করে। অন্ততপক্ষে আমার কোনও কাজ যাতে দেশের জন্য ক্ষতিকর না হয়, এতটুকু সচেতনতাই বা কজনের আছে? কাজেই সুনাগরিক হওয়া খুব সোজা কথা নয়। তারপর কারও চরিত্রবান হওয়াটা অনেক বড় ব্যাপার। চরিত্র নবী-রাসূলগণের শিক্ষার একটি প্রধান ধারা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, بعثت لاتمم مكارم الأخلاق
আমাকে পাঠানো হয়েছে উত্তম চরিত্রের পূর্ণতাবিধানের জন্য’
মানবচরিত্রের বহু দিক আছে। তার সবগুলোতে যে শূচিশুদ্ধ, সে-ই চরিত্রবান। কে সত্যবাদী, আমানতদার, বদান্য, বিশ্বস্ত, সরল ও অকপট, উদারপ্রাণ, ক্ষমাপ্রবল, সহনশীল ও নিঃস্বার্থ তার কতটুকু আমরা জানি? সুতরাং নিশ্চিত না হয়ে নিশ্চিতমনে কাউকে চরিত্রবান বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়া যায় কি করে? তা দিতে গেলে তো নিজেরই চারিত্রিক শুদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায় এ সনদের পেছনে কোনও রকম লেন-দেনের ব্যাপার নেই তো? কিংবা কাজ করেনি তো কিছুটা স্বজনপ্রিয়তা? আর কিছুও যদি না থাকে তবে দায়িত্বজ্ঞানের অভাব বলে অভিযোগ আসবেই। যেভাবেই হোক না কেন, নিশ্চিতভাবে না জেনে কাউকে চরিত্রসনদ দিলে তাতে সংশ্লিষ্টজনদের সাথে এক রকম খেয়ানত হয়ে যায়। কখনও বা জাতির সাথেও। কাজেই চরিত্রসনদ দিতেও সাবধানতা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে মধ্যম পন্থা হল অজ্ঞাত কাউকে চরিত্রসনদ না দেওয়া। আর যাদের সম্পর্কে জানা আছে তাদেরকে সতর্কতার সাথে দেওয়া। মুখস্থ শব্দ না আউড়িয়ে যার সম্পর্কে যতটুকু জানা থাকে ঠিক ততটুকুই লেখা।

পরবর্তী অংশ সমূহ:

প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৪
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৫

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE