ভালো-মন্দের চার সাক্ষী-১

আমাদের প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, আমাদের উঠা-বসা, চলা-ফেরা সবকিছুর ভালো-মন্দের থাকছে চারটি সাক্ষী। আমরা যেখানেই থাকি; আলোতে বা আঁধারে, জনসমাবেশে বা লোকচক্ষুর অন্তরালে, দিনে কিবা রাতে, সকালে কি সন্ধ্যায়, সব সময়ই আমরা চারটি সাক্ষীর আওতাভুক্ত। কোনো কথা বা কোনো কাজ যত গোপনেই করি না কেন, চারটি সাক্ষী থেকে আমরা তা গোপন করতে পারি না। তারপরও কীভাবে আমরা নাফরমানীর পথে পা বাড়াই!

প্রথম সাক্ষী : যমীন

প্রথম সাক্ষী হল এই যমীন; আমাদের পায়ের নিচের মাটি, পায়ের নিচের আশ্রয়। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা যার উপর অবস্থান করছি, চলা-ফেরা করছি, আহার গ্রহণ করছি, নিদ্রা যাচ্ছি। যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমাদের দান করছেন আমাদের রিযিক; হাজার রকমের ফল-ফসল, যা খেয়ে আমরা জীবন ধারণ করছি। প্রতিটি মুহূর্তে আমরা যার মুখাপেক্ষী। যার গর্ভ হবে আমাদের শেষ ঠিকানা। এই যমীন আল্লাহ তাআলার অনেক বড় একটি নিআমত। কিন্তু…! কিন্তু কখনো আমরা ভুলে যাই এই নিআমতের কথা, এই নিআমতের যিনি মালিক তাঁর কথা। আমরা লিপ্ত হয়ে পড়ি নাফরমানিতে, এই যমীনের পৃষ্ঠে, যমীনের রবের নাফরমানিতে। যমীনের সহ্য হয় না। কিন্তু তার রবের হুকুমে নীরবে সে বহন করে চলে আমার মত পাপীকে। আমাকে সে গিলে ফেলে না।
আল্লাহ নাফরমান বান্দাকে সতর্ক করে বলছেন, (তরজমা) ‘‘ তোমরা কি আসমানওয়ালার থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দেবেন না, যখন তা হঠাৎ থরথর কাঁপতে থাকবে?
-সূরা মুল্ক ৬৭:১৬ (যেমন তিনি কারূনকে ভূগর্ভে ধ্বসিয়ে দিয়েছিলেন, তেমনি আমাদেরকেও ধ্বসিয়ে দিতে পারেন।)

পানাহ আল্লাহ! পাপে লিপ্ত অবস্থায় যদি যমীন গিলে ফেলে আমাকে। বা মালাকুল মওত যদি হাযির হয় জান কবজ করতে! কী অবস্থা হবে তখন আমার! হে আল্লাহ, নিজের উপর অনেক যুলুম করেছি। মাফ কর সকল গুনাহ নিজ অনুগ্রহে। তুমি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার তো আর কেউ নেই। হেফাযত কর সব ধরনের নাফরমানি থেকে। (বান্দা যখন বলে, ‘তুমি ছাড়া গুনাহ ক্ষমা করার তো আর কেউ নেই’ তখন আল্লাহ খুশি হন, মাফ করে দেন।)

হাঁ, কোনো মানুষ জানে না আমার পাপের কথা। যমীন গিলে ফেলে না আমাকে। তবে…! তবে সে সাক্ষী হয়ে থাকে আমার নাফরমানির। তার সাক্ষী হওয়ার ব্যাপারে আমি উদাসীন, কিন্তু সে উদাসীন নয়। সে সব বলে দিবে, তার রব যেদিন তাকে বলার অনুমতি দিবেন। হে আমার রব, আমি সাক্ষী। তোমার এই বান্দা তোমার হাজারো নিআমত ভোগ করে, আমার পৃষ্ঠে অবস্থান করে, অমুক পাপ করেছিল, অমুক দিন করেছিল, অমুক সময় করেছিল। আমি তার সাক্ষী হে আল্লাহ!

যমীনের এই সাক্ষী হওয়ার বর্ণনা আলকুরআনুল কারীমে ও হাদীস শরীফে এভাবে এসেছে –

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিলাওয়াত করলেন,

” يَوْمَئِذٍ تُحَدِّثُ أَخْبَارَهَا ”

(তরজমা) সেদিন যমীন তার যাবতীয় সংবাদ জানিয়ে দেবে। (সূরা যিলযাল ৯৯ : ৪)
তারপর বললেন, তোমরা কি জানো, ‘যমীনের সংবাদ’ কী?
সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তার সংবাদ’ হল, প্রতিটি বান্দা-বান্দি যমীনে যা করেছে সে তার সাক্ষী দিবে; অমুক বান্দা অমুক অমুক কাজ করেছে, অমুক দিনে করেছে। এটাই হল, ‘তার সংবাদ’।
-জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪২৯

তেমনিভাবে এই যমীন আমার সকল ভাল কাজের সাক্ষী হবে। আমি যদি এই যমীনে আল্লাহর ঘর নির্মাণের জন্য এক টুকরো যমীন খরিদ করি তা কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সাক্ষী দেবে। আমার জন্য জান্নাতের বালাখানার সাক্ষী হবে। তেমনি যমীনের যে অংশে যে ভাল কাজ আমি করব, তা আল্লাহর দরবারে আমার ঐ ভাল কাজের সাক্ষী হবে। দিন তারিখসহ সে সাক্ষী দেবে; হে আল্লাহ তোমার অমুক বান্দা, অমুক দিন, অমুক সময় এই ভাল কাজ করেছিল, আমি তার সাক্ষাৎ-সাক্ষী।

দ্বিতীয় সাক্ষী : ফিরিশতা (ও তাদের লিপিবদ্ধ আমলনামা)

দ্বিতীয় সাক্ষী হল ফিরিশতা। আমাদের অমলনামা লিপিবদ্ধের কাজে নিয়োজিত ফিরিশতা । আমরা যা ভাল কাজ করি তাঁরা তা লিপিবদ্ধ করেন। আমরা যা মন্দ কাজ করি তাঁরা তাও লিপিবদ্ধ করেন। তাঁরা তৈরি করেন এমন এক আমলনামা যা কোনো ছোট আমলও ছাড়ে না, কোনো বড় আমলও বাদ দেয় না। যে আমলনামা কিয়ামতের দিন আমাদের সামনে মেলে ধরা হবে। আমরা সেদিন স্বচক্ষে তা দেখতে পাব।

তাঁরা সম্মানিত ফিরিশতা, তাঁরা আমাদের অমলনামা লিপিবদ্ধ করছেন। সকালে সন্ধ্যায়, দিনে রাতে, সদা সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ، كِرَامًا كَاتِبِينَ، يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ، إِنَّ الْأَبْرَارَ لَفِي نَعِيمٍ، وَإِنَّ الْفُجَّارَ لَفِي جَحِيمٍ.

(তরজমা) অবশ্যই তোমাদের জন্য কিছু তত্বাবধায়ক (ফিরিশতা) নিযুক্ত আছে। সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ। তোমরা যা কর তারা সব জানে। পূণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বচ্ছনেদ্য; এবং পাপাচারীরা তো থাকবে জাহান্নামে।
-সূরা ইনফিতার ৮২: ১০-১৪

আমরা যা প্রকাশ্যে করি যা গোপনে করি, দিনের আলোয় করি বা রাতের অন্ধকারে করি, সব আল্লাহ জানেন। সাথে সাথে তাঁর ফিরিশতাগণও তা লিপিবদ্ধ করছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَاهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ

তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথাবার্তা ও তাদের কানাকানি শুনতে পায় না? অবশ্যই শুনতে পাই। তাছাড়া আমার ফিরিশতাগণ তাদের কাছেই রয়েছে। তারা (সবকিছু) লিপিবদ্ধ করছে।’
-সূরা যুখরুফ : ৪৩ ৮০

আমি যতদিন বেঁচে থাকব, যত আমল করব, সব ফিরিশতারা লিপিবদ্ধ করতে থাকবেন। যেদিন আমি ইন্তেকাল করব সেদিন তাদের এই আমলনামা লেখা শেষ হবে। তবে হাঁ, আমার কিছু আমলের সাওয়াব চলতে থাকবে এবং এই আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। নেক আমল বা বদ আমল। ‘সাওয়াবে জারিয়া’ বা ‘গুনাহে জারিয়া’।

আমি যদি এমন কোনো ভাল আমল করি যার ফলাফল চলমান, তাহলে যতদিন তা চলতে থাকবে আমার আমল করার শক্তি ও সুযোগ ফুরিয়ে যাবার পরও ঐ আমলের সাওয়াব যুক্ত হতে থাকবে আমার আমলনামায়। যে ফলাফল দেখে আমি কিয়ামতের দিন বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলব, এত আমল আমি কবে করলাম? আমার আমলনামার ভাণ্ডার এত সমৃদ্ধ হল কী করে? হাঁ, এমনই হবে আমার আমলনামা যদি রেখে যাই কোনো নেক সন্তান বা নেক আলেম সন্তান। সে যত ভাল কাজ করবে তার সাওয়াবের ভাগ যুক্ত হবে আমার আমলনমায়।

কিন্তু…! কিন্তু আমি যদি এমন কোনো বদ আমল করি যার পাপ চলমান। তাহলে আমার আর রক্ষা নেই। আমার মত হতভাগা আর কেউ নেই। সুতরাং এখন থেকেই সাবধান! খুবই সাবধান!! আমি নিজেকে মুক্ত করব, এখনই মুক্ত করব; যদি আমি এমন কোনো কাজ করে থাকি। আমার সন্তানকে যদি আমি নাচ-গান শিখিয়ে থাকি যার কারণে তার গুনাহ হবে এবং যত মানুষ তার নাচ-গান দেখবে সব গুনাহ তার হবে এবং আমি বেঁচে থাকতে তো অবশ্যই, মরে যাওয়ার পরও আমার এ গুনাহে জারিয়া আমার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে (নাউযুবিল্লাহ্, তোমার পানাহ হে আল্লাহ!)। তা আমাকে ভোগাবে কবরে, হাশরে, মিযানে, পুলসিরাতে। এভাবে চলমান গুনাহের যত পথ আছে আমি যদি তার কোনোটা অবলম্বন করি, তা আমার গুনাহের বোঝাকে করবে বিশাল, আরো বিশাল। কোন্ নির্বোধ আছে যে এপথ অবলম্বন করবে। আল্লাহ হেফাযত করুন।

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে,

مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى، كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا، وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ، كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا

অর্থ: যে ব্যক্তি হেদায়েতের দিকে আহবান করবে, তার আহবানে যারা হেদায়েতের অনুসরণ করবে, সে ব্যক্তি অনুসরণকারীদের সমান প্রতিদান পাবে এবং তা তাদের প্রতিদানে সামান্যও হ্রাস ঘটাবে না। আনুরূপ যে ব্যাক্তি কোনো গোমরাহীর দিকে আহবান করবে, তার আহবানে যারা গোমরাহীর অনুসরণ করবে, সে ব্যক্তিরও অনুসরণকারীদের সমান পাপ হবে এবং তা তাদের পাপের মাঝে সামান্যও হ্রাস ঘটাবে না।
– সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৭৪; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৬৭৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৬০৯; সুনানে ইবনে মাজাহ্, হাদীস ২০৬

এভাবে পাপের বোঝা ভারি হবে বা পুণ্যের। তারপর কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমার আমলনামা বের করে দিয়ে দিবেন আমার হতে। ইরশাদ হচ্ছে,

وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنْشُورًا

(তরজমা) ‘‘আর কিয়ামতের দিন আমি (তার আমলনামা) লিপিবদ্ধরূপে তার সামনে বের করে দেব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।’’
-সূরা বনী ইসরাঈল ১৭: ১৩

সে এক আশ্চর্য মুহূর্তে। হাশরের ময়দানে বান্দা নগ্নপায়ে, নগ্নবদনে রাববুল আলামীনের সামনে দাঁড়ানো। নিজের আমলনামা নিজের হাতেই উপস্থিত। তাতে দেখা যাচ্ছে নিজের সব নেক আমল ও বদ আমল। সেদিন কী অবস্থা হবে আমার, যদি আমি দেখি আমার অমলনামায় নেকির চেয়ে বদী বেশি। কী জবাব দিব রাববুল আলামীনের সামনে?

বিষয় কি এখানেই শেষ, বরং আল্লাহ আমাকেই পড়তে বলবেন আমার আমলনামা।

اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا

‘‘(বলা হবে) তুমি নিজ আমলনামা পড়। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নেয়ার জন্য যথেষ্ট।’’
-সূরা বনী ইসরাঈল ১৭: ১৪

কারণ সে আমলনামা হবে এক আশ্চর্য আমলনামা। আমলের ছোট বড় কিছুই ছাড়বে না, সব যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে সেখানে। তা দেখে মানুষ সেদিন বলবে, (তরজমা) ‘…এটা কেমন কিতাব (আমলনামা) তা তো ছোট বড় কিছুই বাদ দেয় না; বরং সবই পঙ্খানুপুঙ্খু হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারও প্রতি যুলুম করেন না।
– সূরা কাহ্ফ ১৮: ৪৯

সেদিন আমলনামা দেখে কাফের আফসোস করে বলবে- (তরজমা) সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে এবং কাফের বলবে, হায়, আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম।’
-সূরা নাবা ৭৮: ৪০

আমলনামা হাতে পেয়ে কেউ থাকবে মহানন্দে, আবার কারো আক্ষেপের সীমা থাকবে না। আলকুরআনুল কারিমে বড় আবেদনময় ভাষায় চিত্রায়িত করা হয়েছে সে সময়ের অবস্থাটির। তারপরও কি আমি সতর্ক হব না?! ইরশাদ হচ্ছে-
(তরজমা) ‘অতপর যাকে আমলনামা দেওয়া হবে ডান হাতে, সে বলবে, এই যে আমার আমলনামা, তোমরা পড়ে দেখ। আমি আগেই বিশ্বাস করেছিলাম, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে থাকবে সুখময় জীবনে। সেই সুউচ্চ জান্নাতে- যার ফল থাকবে ঝুঁকে (হাতের নাগালের মধ্যে)। (বলা হবে) তোমরা বিগত জীবনে যেসব কাজ করেছিলে, তার বিনিময়ে খাও ও পান কর স্বাচ্ছন্দ্যে।

আর যার আমলনামা দেওয়া হবে তার বাম হাতে; তো সে বলবে, আহা! আমাকে যদি আমলনামা দেওয়াই না হত! আর আমি জানতেই না পারতাম, আমার হিসাব কী? আহা! মৃত্যুতেই যদি আমার সব শেষ হয়ে যেত! আমার অর্থ-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসল না! আমার থেকে আমার সব ক্ষমতাও লুপ্ত হয়ে গেল! (এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কে হুকুম দেয়া হবে) ধর ওকে এবং ওর গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর ওকে নিক্ষেপ কর জাহান্নামে।’
-সূরা আল-হাক্কাহ্ ৬৯:১৯-৩১

পরবর্তী অংশ:
ভালো-মন্দের চার সাক্ষী-২

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE