কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে ভাব-গাম্ভীর্যমিশ্রিত কণ্ঠে আবেগ ও অনুভূতির সাথে

কুরআন শরীফ

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা দেওয়া কুরআন তিলাওয়াত পদ্ধতির একটি বৈশিষ্ট্য-  ‘তাহসীনুছ্ছাউত’। যার অর্থ হল-  ভাব-গাম্ভীর্যমিশ্রিত কণ্ঠে আবেগ অনুভূতির সাথে আল্লাহর কালামকে সুন্দর করে পড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্দর করে তিলাওয়াত করতেন। সুন্দর করে তিলাওয়াত শিক্ষা দিয়েছেন। সুন্দর তিলাওয়াতে উৎসাহ যুগিয়েছেন। বরং সুন্দর করে তিলাওয়াত করতে জোর তাগিদ করেছেন। উদাহারণস্বরূপ এ সংক্রান্ত কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরছি-

ক. হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বর্ণনা করেছেন-

سمعت النبي صلى الله عليه و سلم يقرأ والتين والزيتون في العشاء، وما سمعت أحدا أحسن صوتا منه أو قراءة .

‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইশার নামাযে সূরা তীন পড়তে শুনেছি। কাউকে তাঁর থেকে সুন্দর আওয়াজে কেরাত পড়তে শুনিনি । (সহীহ বুখারী-৭১০৭, সহীহ মুসলিম-৪৬৪০)

খ. আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন-

قال لي النبي صلى الله عليه و سلم اقرأ علي، قلت: أأقرأ عليك وعليك أنزل ؟ قال فإني أحب أن أسمعه من غيري. فقرأت عليه سورة النساء حتى بلغت “فكيف إذا جئنا من كل أمة بشهيد وجئنا بك على هؤلاء شهيدا”.  قال  أمسك. فإذا عيناه تذرفان.

‘নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন-  একটু কুরআন পড়ে শুনাও। বললাম-  আপনার উপর কুরআন নাযিল হয়, আর আমি আপনাকে কুরআন শুনাব?! নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি অন্যের তিলাওয়াত শুনতে আগ্রহী । আমি তখন সূরা নিসা পড়তে শুরু করলাম। যখন “فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا ” (সূরা নিসা-৪১) আয়াতটি পর্যন্ত পড়লাম। তিনি আমাকে থামতে বললেন। তাকিয়ে দেখি তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে । (সহীহ বুখারী-৪৩০৬)

গ. হযরত ফাযালা ইবনে উবাইদ রা. রিওয়ায়েত করেন-

أن رسول الله صلى الله عليه و سلم قال : لله أشد أذنا إلى الرجل الحسن الصوت بالقرآن من صاحب القينة إلى قينته. رواه الحاكم فى المستدرك وقال:هذا حديث صحيح على شرط الشيخين و لم يخرجاه.

‘কোন ব্যক্তি তার (গায়িকা) বাদীর গান যত মনোযোগসহকারে শুনে, সুন্দর কণ্ঠে সুন্দর করে যে কুরআন তিলাওয়াত করে আল্লাহ তা‘আলা তার তিলাওয়াত আরো বেশি মনোযোগ দিয়ে শুনেন। (মুসতাদরাক হা.২০৯৭, সহীহ ইবনে হিব্বান-৭৫২, মুসনাদে আহমদ-২৩৯৯২)

ঘ. হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন-

أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ : مَا أَذِنَ اللَّهُ لِشَىْءٍ مَا أَذِنَ لِنَبِىٍّ حَسَنِ الصَّوْتِ يَتَغَنَّى بِالْقُرْآنِ يَجْهَرُ بِهِ .

‘আল্লাহ তা‘আলা কোন জিনিস এত মনোযোগসহকারে শুনেন না, যতটুকু মনোযোগের সাথে শুনেন সুন্দর কণ্ঠস্বরের অধিকারী নবীর কুরআনের তিলাওয়াত, যখন তিনি স্বশব্দে সুন্দর করে পড়েন’। (সহীহ মুসলিম-৭৯২, সহীহ বুখারী-৫০২৩-৫০২৪)

ঙ. হযরত আবু মূসা আশ্আরী রা. এর সুন্দর তিলাওয়াতের প্রশংসায় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-  يَا أَبَا مُوسَى لَقَدْ أُوتِيتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ.  ‘আবূ মূসা! দাউদ আলাইহিস সালামের কণ্ঠের মত তোমাকেও সুন্দর কণ্ঠস্বর দান করা হয়েছ ‘। (সহীহ বুখারী-৫০৪৮, সহীহ মুসলিম-৭৯৩)

চ. হযরত বারা ইবনে আযিব রা. বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-  زَيِّنُوا الْقُرْآنَ بِأَصْوَاتِكُمْ  ‘কুরআনকে সুন্দর আওয়াজে সুন্দর করে পড়’। (সুনানে নাসায়ী-১০১৪, সুনানে আবু দাউদ-১৪৬৮)

ছ. অবশেষে সুন্দর করে তিলাওয়াত করার জোর তাগিদ করে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-  لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَتَغَنَّ بِالْقُرْآنِ.  ‘যে (সাধ্যমত) সুন্দর করে কুরআন পড়েনা, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। (সুনানে আবু দাউদ-১৪৭১)

উক্ত হাদীসে “تغنّى ” শব্দের অর্থ সম্পর্কে ইমাম ত্বাহাবী রহ. বলেন- وَقال قَوْمٌ: هُوَ عَلَى تَحْسِينِ الصَّوْتِ لِيَرِقَّ لَهُ قَلْبُ مَنْ يَقْرَؤُهُ   ‘অর্থাৎ,  সুন্দর আওয়াজে পড়বে যাতে করে তিলাওয়াতকারীর অন্তরে কোমলতা ও নম্রতা সৃষ্টি হয়। বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আবি মুলাইকাকে জিজ্ঞেস করা হল-  যার আওয়াজ সুন্দর নয় এবং সুন্দর করে পড়তে জানেনা, সে কি করবে? তিনি বলেন-   يُحَسِّنُهُ مَا اسْتَطَاعَ   ‘সাধ্যমত সুন্দর করার চেষ্টা করবে। (মুশকিলুল আছার ৩/৩৫০ সুনানে আবিদাউদ-১৪৭১) ইমাম নববী রহ. বলেন-‘ تغنّى ’ অর্থ হল-  ‘يحسن صوته بالقرآن’ সুন্দর আওয়াজে কুরআন পড়া। (রিয়াজুসসালেহীন-পৃ.৪২২)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ.  বলেন-

والذي يتحصل من الأدلة أن حسن الصوت بالقرآن مطلوب، فإن لم يكن حسنا فليحسنه ما استطاع،كما قال ابن أبي مليكة أحد رواة الحديث. وقد أخرج ذلك عنه أبو داود بإسناد صحيح. ومن جملة تحسينه- أن يراعى فيه قوانين النغم. فإن الحسن الصوت يزداد حسنا بذلك، وإن خرج عنها أثر ذلك في حسنه. وغير الحسن ربما انجبر بمراعاتها ما لم يخرج عن شرط الأداء المعتبر عند أهل القراءات. فإن خرج عنها لم يف تحسين الصوت بقبح الأداء.

‘দলিল প্রমাণের আলোকে একথাই স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, সুন্দর আওয়াজে কুরআন পড়াটাই (শরিয়তে) কাম্য। কেউ যদি সুন্দর কণ্ঠের অধিকারী না হয়, তাহলে সাধ্যমত সুন্দর করে  পড়ার চেষ্টা করবে। যেমনটি বলেছেন বর্ণনাকারী ইবনে আবী মুলাইকা রহ.। ইমাম আবু দাউদ সহীহ সনদে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। সুন্দর করে পড়ার একটি তরিকা হল সুর ও সুরকারদের নিয়মাবলীর অনুসরণ করা। এর মাধ্যমে সুন্দর কণ্ঠ আরো অধিক পরিমাণে সুন্দর হয়। আর এ নিয়মাবলীর অনুসরণ না করলে অনেক সময় সুন্দর আওয়াজেও অসংলগ্নতা সৃষ্টি হয়। আবার অসুন্দর আওয়াজও নিয়মাবলীর অনুকরণের মাধ্যমে অনেকটা সুন্দর হয়ে যায়। তবে শর্ত হল তিলাওয়াত তাজবীদে কেরাতের আলোকে শুদ্ধ হতে হবে। (ফাতহুল বারী-৮/৭৬)

উপরোক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট বুঝা যায় যে, কুরআন তিলাওয়াতের একটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যমন্ডিত পদ্ধতিতে সুন্দর আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা দেওয়ার জন্যই নবীজীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গড়গড় করে পড়ে নিলেই কুরআন তিলাওয়াতের হক্ব আদায় হবেনা। অথচ কেবল অর্থ বুঝা ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য এ বিশেষ পদ্ধতিতে কুরআন পড়ারকোন প্রয়োজন ছিল না।

1 Comment

  1. Pingback: কুরআন বুঝে পড়তে সচেষ্ট পাঠকদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় | ইসলাম বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE