কুরআন নিয়ে চিন্তা ভাবনা ও তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে হবে

কুরআনুল কারীম

মহান রাব্বুল আলামীন তার পবিত্র কালামুল্লাহ কেবল মাত্র পড়ার জন্য নাজিল করেন নি। কুরআনুল কারিম প্রেরন করা হয়েছে সঠিক দিক নির্দেশনা হিসেবে। আর এই দিক নির্দেশনা পাওয়ার জন্য কুরআন নিয়ে গবেষনা করতে হবে। তাহলেই আমরা নিত্য নতুন জিনিস বরে করতে পারবো। এ  প্রসঙ্গে  উস্তাযে মুহ্তারাম মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মালেক ছাহেব দা.বা. স্বীয় উস্তায, হযরত মাওলানা মুহাম্মদ তাকী উসমানী দা.বা. এর ‘আসান তরজুমায়ে কুরআনের’ বঙ্গানুবাদের ভূমিকায় লেখেন-

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-

كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ

“হে নবী! এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি এই জন্য নাযিল করেছি যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরাসোয়াদ-২৯)

কুরআনের মাঝে তাদাব্বুর বা চিন্তা-ভাবনা করার অনেক বড়-বড় ফায়দা রয়েছে। সবচেয়ে বড় ফায়দা তো এই যে, এর দ্বারা ঈমান নসীব হয়, ও ঈমান সজীব হয়। দ্বিতীয় ফায়দা হল, এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণের নিয়ামত লাভ হয়। এ জন্যই কুরআন মাজীদের তেলাওয়াত চিন্তা ও ধ্যানমগ্নতার সাথে করা বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজনে কোন কোন আয়াত বা আয়াতের অংশ বিশেষ বারবার পড়তে থাকা চাই। নামাযেও ধ্যানের সাথে তেলাওয়াত করা ও লক্ষ করে শোনা একান্ত কাম্য।

তবে তাদাব্বুর ও চিন্তা-ভাবনা করার ভেতরও স্তরভেদ রয়েছে। প্রত্যেকের জন্য প্রত্যেক স্তরের চিন্তা-ভাবনা সমীচীন নয় এবং উপকারীও নয়। (মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ.- মাআরিফুল কুরআন, ২য় খন্ড, ৪৮৮-৪৮৯পৃ.)

ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে, এমন কিছু লোকও কুরআনের গবেষণায় নেমে পড়েছে যারা কুরআনের ভাষাও বোঝে না এবং কুরআন বোঝার বুনিয়াদী বিষয়সমূহ সম্পর্কেও খবর রাখেনা। তদের এ গবেষণা বিলকুল নীতিবিরুদ্ধ। সুতরাং এটা কুরআনের মাঝে চিন্তা-ভাবনা করার অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণেই এর দ্বারা উপদেশ গ্রহণের ফয়দা আদৌ হাসিল হয় না;  উল্টো কুরআনের তাহরীফ তথা কুরআনকে বিকৃত করার পথ খুলে যায়।

এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআনের তাদাব্বুর কেবল অর্থ বুঝার নাম নয়। অর্থ তো আরবের কাফের, মুশরিক ও মুনাফিকরাও বুঝত, কিন্তু তারা তাদাব্বুর আদৌ করত না। তাদাব্বুর না করার কারণে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন মাজীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের নিন্দা করেছেন। তাদাব্বুরের উদ্দেশ্য হল-  উপদেশ গ্রহণের লক্ষ্যে, ভক্তি ও ভালোবাসা সহকারে, চিন্তা ও ধ্যানমগ্নতার সাথে আয়াতসমূহ পাঠ করা, সেই সঙ্গে সতর্ক থাকা, যাতে আল্লাহ তা‘আলার উদ্দিষ্ট মর্ম বোঝার ক্ষেত্রে আমার ব্যক্তিগত মেজাজ-মর্জি, ভাবাবেগ ও চিন্তা-চেতনার কিছুমাত্র প্রভাব না পড়ে।

তাদাব্বুর ফলপ্রসূ ও ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার জন্য একটি বুনিয়াদী শর্ত এই যে, লক্ষ রাখতে হবে তাদাব্বুরের ফল যেন প্রজন্ম পরম্পরায় প্রাপ্ত ‘আকীদা-বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, চূড়ান্ত শর‘ঈ বিধান ও সালাফে সালিহীন বা মহান পূর্বসূরীদের ঐকমত্যভিত্তিক তাফসীরের পরিপন্থী না হয়, সে রকম হলে নিশ্চিত ধরে নিতে হবে তাদাব্বুর সঠিক পন্থায় হয়নি, যদ্দরুণ তা থেকে সঠিক ফল উৎপন্ন হয়নি। ‘আশরাফুত-তাফাসীর’- এর ভূমিকায় হযরতুল-উসতায লিখেছেন, কুরআন মাজীদ সম্পর্কে যথার্থই বলা হয়েছে-   لا تنقضي عجائبه অর্থাৎ এর শব্দমালা ও বর্ণনাশৈলীর ভেতর যে নিগূঢ় রহস্য ও অথৈ তাৎপর্য্য নিহিত আছে, তা কখনও শেষ হবার নয়। এটা আল্লাহ তাআলার কালামের এক অলৌকিকত্ব যে, যখন অতি সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধির কেউ সাদামাঠাভাবে এ কিতাব পড়ে, তখন সাধারণ স্তরের হিদায়াত লাভের জন্য যতটুকু বোঝা দরকার, নিজ জ্ঞান মাফিক সে অতি সহজেই তা বুঝে ফেলে। আবার একজন পন্ডিতমনস্ক ব্যক্তি যখন এ কালাম থেকেই বিধি-বিধান আহরণ এবং হিকমত ও রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করে, তখন এ তত্ত্ব-ভারের ব্যাপ্তি ও গভীরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ কারণেই কুরআন মাজীদ বিভিন্ন স্থানে তাদাব্বুরের আদেশ করেছে। কেননা এ তাদাব্বুরের ফলশ্রুতিতে অনেক সময় কোন একজন ‘আলেমের কাছে এমন কোন তত্ত্ব উদঘাটিত হয়, পূর্বে যেদিকে আর কারও নজর যায়নি।

তবে মনে রাখতে হবে নিত্য-নতুন তাৎপর্য্য খুঁজে বের করার বিষয়টি ওয়াজ-নসীহতের সাথে সম্পৃক্ত কিংবা সৃষ্টি-রহস্য, তত্ত্বজ্ঞান ও শর‘ঈ বিধানাবলীর হিকমতের সাথে। কেবল এ ময়দানেই এমন নতুন-নতুন রহস্যের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে, যেদিকে প্রাচীনদের কারও দৃষ্টি যায়নি। এটাকেই হযরত ‘আলী রা. এভাবে ব্যক্ত করেছেন-اَوْفهمٌ اُعطيه رجلٌ مسلمٌ  ‘অথবা এমন উপলব্ধি, যা কোনও মুসলিম ব্যক্তিকে দান করা হয়’। মোটকথা বিষয়টা উপরিউক্ত ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। ‘আকাইদ ও আহকামের ময়দান এর থেকে ভিন্ন। এখানেও যে কেউ চাইলেই গোটা উম্মতের ইজমার বিপরীতে এমন কোনও তাফসীর করতে পারবে, যা স্বীকৃত বিশ্বাস ও বিধানের পরিপন্থী,  আদৌ সে সুযোগ নেই। কেননা তার অর্থ দাঁড়াবে কুরআন যে ‘আকাইদ ও আহকামের প্রচারার্থে এসেছিল তা অদ্যাবধি অজ্ঞাত ও দুর্বোধ্য রয়ে গেছে। বলা বাহুল্য তাতে ‘ইসলাম’-ই বিলকুল অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায়  ।‘নাউযুবিল্লাহ”। (আশরাফুত তাফাসীর, ১ম খ, ১০ পৃ.)

অতএব আমাদের সকলেই উচিত কুরআন শরীফে কি বলা হয়েছে তা নিয়ে অনুসন্ধান করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্ঠা করা। তবে এর একটি পরিমাপ আছে। সব ক্ষেত্রে নিজের জ্ঞান না খাটিয়ে পূর্বসূরীরা কি বলে গেছে সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে কুরআনের সঠিক ও সহী বুঝ দান করুক। আমীন।

1 Comment

  1. Pingback: কুরআন বুঝে পড়তে সচেষ্ট পাঠকদের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় | ইসলাম বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE