অন্যের সাথে ঐ আচরণ করি যা পেলে আমি খুশী হই

কুরআন মজীদের প্রসিদ্ধ আয়াত-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ

হে ঈমানদারগণ! পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সম্বোধন করে বলেছেন, ‘তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর।’ পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করার অর্থ কী? এই যে আমরা মসজিদে প্রবেশ করেছি, পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ আমাদের দেহের কোনো অংশ মসজিদের বাইরে নেই। যদি আমার পা মসজিদের ভেতরে থাকে আর মাথা মসজিদের বাইরে তাহলে বলা হবে না যে, আমি মসজিদে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করেছি। তো আল্লাহ মুমিনদের আদেশ করেছেন, ‘তোমরা ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ কর।’ অর্থাৎ তোমাদের জীবনের সকল অংশ যেন ইসলামের ভেতরে চলে আসে। জীবনের কিছু অংশ ইসলামের ভেতরে আর কিছু অংশ ইসলামের বাইরে, কিছু অংশে  ইসলামের অনুসারী আর কিছু অংশে ইসলাম থেকে খারিজ এমন যেন না হয়। আর এ আদেশ আল্লাহ কোনো অমুসলিমকে করেননি। এ আদেশ করেছেন মুমিনকে, মুসলিমকে।

ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করতে হলে সর্বপ্রথম ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে জানতে হবে, ইসলামের শিক্ষা ও বিধানের বিস্তৃতি সম্পর্কে জানতে হবে। তা জানলে মানার চিন্তা আসবে। না জানলে মানার চিন্তাও আসবে না। তাই ইসলামের  শিক্ষা ও বিধানের ব্যাপকতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়টি দু’ভাবে চিন্তা করা যায়।
এক. জীবনের অঙ্গনগুলো সম্পর্কে চিন্তা করা। জীবনের সকল অঙ্গনে ইসলামের শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা আছে।
দুই. ইসলামী শিক্ষার বিভাগগুলো সম্পর্কে চিন্তা করা। এর একটি সহজ উপায় হল, আপনি একটি হাদীসের কিতাব হাতে নিন এবং শুধু শিরোনামগুলো পড়ুন। তাহলে দেখতে পাবেন আমরা যতটুকু চিন্তা করি তার চেয়ে বিস্তৃত আকারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা রয়েছে। তেমনি একটি ফিকহের কিতাব হাতে নিন এবং শুধু সূচীপত্রে নযর বুলান। দেখবেন আমরা যতটুকু ভাবি তার চেয়ে অনেক ব্যাপকভাবে ইসলামের বিধানাবলী বিদ্যমান।

আলিমগণ ইসলামের মৌলিক বিধানাবলী পাঁচটি শিরোনামে তুলে ধরেছেন :
আকীদা, ইবাদত, মোয়ামালাত, মোয়াশারাত ও আখলাক।

আকীদা অর্থ বিশ্বাস। এটি অনেক ব্যাপক বিষয়। ইসলামের একটি মৌলিক বিভাগ। ইসলাম মানুষকে সঠিক ও যথার্থ আকীদা শিক্ষা দান করে। যেমন আল্লাহ এক, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল ও শেষ রাসূল, কিয়ামত হবে, পুনরুত্থান হবে ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিভাগ, ইবাদত। ইবাদত মানে  উপাসনা। ইসলামে ইবাদতের প্রসঙ্গ অনেক বিস্তৃত। আমরা যে নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, হজ্ব করি, যাকাত দেই, কুরবানী করি এগুলো  ইসলামের একেকটি ইবাদত।

তৃতীয় বিভাগ, মোয়ামালাত তথা লেনদেন। লেনদেনের ক্ষেত্রে ইসলামের অনেক বিধান আছে। একটি মৌলিক বিধান, বেচাকেনা হালাল, রিবা বা সুদ হারাম।

চতুর্থ বিভাগ, মোয়াশারা। পারস্পরিক আচরণ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে একের সাথে অন্যের আচরণ কী হবে এটি ইসলামের অনেক বড় শাখা।

পঞ্চম বিভাগ, আখলাক। স্বভাব-চরিত্র। যেমন এক হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রিয় সাহাবী হযরত আনাস বিন মালিক রা. কে বলেছেন,
“হে আমার বৎস! তোমার পক্ষে যদি সম্ভব হয় তুমি সকাল সন্ধ্যা এমন অবস্থায় অতিবাহিত করবে যে, তোমার অন্তরে কারো প্রতি বিদ্বেষ নেই, তাহলে তাই কর। কারণ এটি আমার সুন্নাহ। আর যে আমার সুন্নাহকে যিন্দা করে সে আমাকে ভালবাসে। যে আমাকে ভালবাসে সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে”।
-জামে তিরমিযী, হাদীস : ২৬৭৮

আমরা তো সুন্নত বলতে বুঝি নামাজের সুন্নত, রোযার সুন্নত, হজ্বের সুন্নত ইত্যাদি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন, কারো প্রতি বিদ্বেষ না থাকা, সবার প্রতি অন্তর নির্মল থাকা এটিও তার সুন্নত। তো আখলাক সম্পর্কে কুরআন মাজীদে অনেক আয়াত রয়েছে এবং হাদীসের কিতাবসমূহে অনেক হাদীস রয়েছে।

এই যে বিভাগগুলো এর মধ্য থেকে সাধারণত আকায়েদ ও ইবাদতকে দ্বীনের অংশ মনে করা হয়। লেনদেনকেও  কিছু মানুষ মনে করেন ইসলামী শিক্ষার অধীন। কিন্তু এক্ষেত্রেও অধিকাংশ মানুষ অসচেতন। তারা মনে করে, আমাদের লেনদেন আমরা যেভাবে ইচ্ছা করব, যেভাবে লাভ হয় সেভাবে করব

আর মোয়াশারা এবং আখলাক! হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানবী রাহ. বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ অসচেতন। বিশেষভাবে মোয়াশারা বা পারস্পরিক আচরণ সম্পর্কে।’ তারা নফল নামায পড়াকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, বুযুর্গী ও দ্বীনদারী মনে করে কিন্তু কষ্টদায়ক আচরণ থেকে বেচে থাকাকে দ্বীনদারীর বিষয় মনে করে না। তারা এটাকে ব্যক্তিগত সভ্যতা মনে করে । কেউ তা লক্ষ্য করলে সে সভ্য মানুষ। না করলে বড় জোর সে সভ্য ভদ্র নয়। তবে দ্বীনদার থাকতে কোনো অসুবিধা নেই। কী ভয়াবহ ধারণা! অসভ্য অথচ দ্বীনদার!! এটা কীভাবে সম্ভব?

সহীহ মুসলিমে একটি হাদীস  আছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

فمن أحب أن يزحزح عن النار و يدخل الجنة فلتأته منيته وهو يؤمن بالله واليوم الآخر و ليأت إلى الناس الذي يحب أن يؤتى إليه.
যে চায় তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা হোক এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক তার মৃত্যু যেন এমন অবস্থায় আসে যে, সে আল্লাহর প্রতি এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে। আর মানুষের সাথে তেমন আচরণ করে যেমন আচরণ পেতে সে পসন্দ করে।’

এখানে দুটো বিষয় লক্ষণীয়।
এক. সকল দ্বীনদারী ও পরহেযগারীর মূল উদ্দেশ্য, জান্নাত লাভ করা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া। তো রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়ে দিলেন, জাহান্নাম থেকে বাঁচা ও জান্নাত লাভ করা দুটি জিনিসের উপর নির্ভর করে। একটি হল আল্লাহ তাআলার প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখা। আর দ্বিতীয়টি হল মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করা। তো পারস্পরিক উত্তম আচরণকে আল্লাহর রাসূল জাহান্নাম  থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যম সাব্যসত্ম করেছেন। বোঝা গেল, আদাবুল মুআশারা বা পারস্পরিক আচরণবিধি দ্বীনের একটি অংশ। এটি দ্বীনদারী ও তাকওয়া পরহেযগারীর অন্তর্ভূক্ত। এটি নিছক ব্যক্তিগত ভদ্রতার বিষয় নয়, বরং দ্বীনের বিষয়। এ ছাড়া কেউ পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারে না। পরিপূর্ণ দ্বীনদার হতে পারে না।

দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয় এই যে, মানুষের সাথে এমন আচরণ করা যে আচরণ মানুষের কাছ থেকে পেতে সে পছন্দ করে। একটি মাত্র বাক্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যবহার করেছেন, যাতে‘আদাবুল মুআশারা’ এর সব কিছু এসে গেছে। মানুষের সাথে সুন্দর আচরণের যত ক্ষেত্র হতে পারে এবং যত রূপ হতে পারে, তেমনি অসুন্দর আচরণ থেকে বেঁচে থাকার যত ক্ষেত্র ও রূপ হতে পারে সবকিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই এক বাক্যে এসে গেছে। তদ্রূপ যে মূলনীতি মনে রাখা দ্বারা কোন ক্ষেত্রে কী আচরণ বাঞ্ছনীয় তা সহজভাবে উপলব্ধি করা যায় তাও এই বাক্যে এসে গেছে।
এই যে ওলামায়ে কেরাম একেকটি বিষয়ের আদব ও আচরণবিধি উলেস্নখ করেন- এভাবে করলে সুন্দর হবে,ওভাবে করলে অসুন্দর হবে, এভাবে করলে মানুষ শান্তি পাবে,ওভাবে করলে কষ্ট পাবে, এই যে একেকটি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা- এ সবই এ হাদীসের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক রূপ। আলিমগণ আদব বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচনা করেছেন।
ইমাম বুখারী রাহ.এর কিতাব আছে ‘আল আদাবুল মুফরাদ’। হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী রাহ.-এর কিতাব রয়েছে ‘আদাবুল মুআশারা’। এ সকল কিতাবে তারা মানবজীবনের পরস্পর আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ সব কিছুর গোড়ার কথা, আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী, মানুষের সাথে তুমি ঐ আচরণ করবে যে আচরণ তুমি মানুষের কাছ থেকে পেতে পসন্দ কর।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE