প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৪

পূর্বের অংশ সমূহ:
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -১
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -২
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৩

  বই-পুস্তক সম্পর্কে অভিমত

বিভিন্ন বই-পুস্তক খুললে শুরুতেই দেখা যায়, বইটি সম্পর্কে বিশিষ্ট ও বিখ্যাত কারও অভিমত ছেপে দেওয়া হয়েছে। কখনও তারই হস্তান্তরে কখনও মুদ্রিতাকারে। কোনও বইতে দু-একজনের অভিমত, কোনওটায় বহুজনের। এমন বইও চোখে পড়েছে, যার গোটা একটা ফর্মাই চলে গেছে অভিমতের দখলে। মূল বইতে পৌঁছাতে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ওল্টাতে হয়। সে এক ক্লান্তিকর অভিযাত্রা।

যাহোক বইয়ের শুরুতে অভিমত ছাপানোটাও এমন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। এমনিতে এটা দোষের কিছু নয়। লেখক তার রচনার বিশ্বস্ততাকে বিশ্বাস করানোর জন্য বা তার প্রতি পাঠক সাধারণের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য বরেণ্য কোনও ব্যক্তির অভিমত জুড়ে দিতেই পারে। কিংবা এর উদ্দেশ্য কেবল বরকত লাভও হতে পারে। থাকল তার রচনার শুরুতে কোন বুযুর্গ ব্যক্তির দুটি কথা। হয়ত সেই বরকতে রচনাটি মানুষের সমাদর লাভ করবে বা অন্য কোন কল্যাণ তাকে স্পর্শ করবে। সুতরাং অভিমত ছাপানোতে আপত্তিকর কিছু নেই। যে কারণে বিষয়টির অবতারণা, তা হচ্ছে অভিমতের ভাষা।

প্রায় সব অভিমতেই থাকে রচনার প্রশংসা এবং কেবলই প্রশংসা। কখনও কদাচিৎ সাদামাঠা ভাষায়, অধিকাংশই উচ্ছ্বসিতভাবে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অভিমতযুক্ত রচনাবলীর মধ্যে এমন এমন বইও থাকে রচনার দিক থেকে যা শিল্পমানে উত্তীর্ণ নয়। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, রচনা ও সংকলন একটি উচ্চ পর্যায়ের শিল্প। একটি মানসম্পন্ন রচনার জন্য তথ্য সমৃদ্ধি, বিষয়বস্তুর পূর্ণাঙ্গতা, উপস্থাপনার বলিষ্ঠতা, আলোচনার ধারাবাহিকতা, সুষ্ঠু বিন্যাস, ভাষার মাধুর্য ও গতিময়তা অনেক কিছুই দরকার। (স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এসব অনুষঙ্গের সাথে কিঞ্চিৎ পরিচিত থাকলেও আজও পর্যন্ত এতে আমার দখল আসেনি। যে কারণে একটি শিল্পমানসম্পন্ন রচনা তৈরি করে ফেলার মত দুরাশা আমি করতে পারি না। তবে যারা তা করতে পারে এবং যথারীতি তাদের অগ্রযাত্রা শুরুও হয়ে গেছে, সংখ্যায় কম হলেও আলহামদু লিল্লাহ এরকম কলমশিল্পীদের অস্তিত্ব আমরা মুগ্ধ চোখে দেখতে পাচ্ছি। সেদিন হয়ত দূরে নয় যখন আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় এর প্রয়োজনীয় সংখ্যা পূরণ হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা তা পূরণ করেই দিন- আমীন)

যাহোক বলছিলাম, মানসম্পন্ন রচনার আনুষঙ্গিক বিষয় অনেকগুলো। কিন্তু অনেক বইতেই তার বেশিরভাগ থাকে না বা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে থাকে না। তা সত্ত্বেও তাতে বিশিষ্টজনদের অভিমত ছেপে দেওয়া হয় এবং সাধারণত সে সব অভিমতে বইয়ের প্রশংসাই করা হয়ে থাকে। এটা যেমন পার্থিব বিষয়াদি সংক্রান্ত রচনায় করা হয়, তেমনি দ্বীনী বই-পুস্তকেও।

কোনও বই সম্পর্কে অভিমত দেওয়াটা সেই বই সম্পর্কে সাক্ষ্যের মর্যাদা রাখে। এটা এক ধরনের তাসদীক (সত্যায়ন) ও তাওছীক (বিশ্বস্ততা নিরূপণ)-ও বটে। এর মাধ্যমে অভিমতদাতা পাঠক সাধারণের সামনে বই সম্পর্কে তার মূল্যায়ন তুলে ধরেন। বইটি সম্পর্কে নিজ মতামত ব্যক্ত করেন এবং এর বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে সাক্ষ্য দান করেন। এর ফলে বইটির উপর পাঠকের আস্থা জন্মায় এবং তাতে উপস্থাপিত তথ্যাবলী ও বিষয়বস্তু গ্রহণে উৎসাহী হয়। বোঝাই যাচ্ছে বিষয়টা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এটা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ কাজ। কেননা বইতে যদি কোন ভুল তথ্য থাকে এবং সেই আস্থার ভিত্তিতে পাঠক তা গ্রহণ করে নেয় তবে তাতে তার ও সংশ্লিষ্ট সকলের যে দ্বীনী ও দুনিয়াবী ক্ষতি সাধিত হবে তার দায়ভার কেবল লেখকের উপরই নয়, অভিমতদাতার উরপও বর্তাবে। এ কারণেই আমাদের আকাবিরে দ্বীন (দ্বীনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ) এ ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাদের অভিমতসমূহ (তাকরীয) পাঠ করলে লক্ষ্য করা যায়। শব্দ প্রয়োগে তারা কতটা সতর্ক ছিলেন। রচনার মান এবং তাদের কর্তৃক তা পাঠ সম্পর্কে তাদের শব্দ হত অত্যন্ত মাপাজোখা। বর্তমানকালের আকাবিরে দ্বীনও এক্ষেত্রে তাদের পদাঙ্কানুসারে চলে থাকেন। কিন্তু সাধারণ চিত্র এরকম নয়। অধিকাংশ অভিমতেই দায়িত্বজ্ঞানের ছাপ থাকে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, অভিমত যেন সর্বাবস্থায় প্রশংসামূলকই হতে হয়, তাতে রচনার মান যাই হোক না কেন। কি মৌলিক রচনায়, কি অনুবাদে সর্বত্রই অভিন্ন দৃশ্য। মূলের সাথে অনুবাদের দুস্তর ব্যবধান, কিন্তু উচ্চ প্রশংসার সাথে বলা হয়, অনুবাদ সম্পূর্ণ মূলানুগ। মৌলিক রচনায় তথ্যভুক্তিতে সতর্কতার অভাব, অথচ বলে দেওয়া হয়, অত্যন্ত সারগর্ভ তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রমাণসমৃদ্ধ রচনা। ভাষা সুখপাঠ্য, এমনকি বিশুদ্ধ না হলেও অভিমতে তা মানোত্তীর্ণ হয়ে যায়। এবংবিধ আরো বহু শিথিলতায় বর্তমানকালের অভিমত তার ওজন হারাতে বসেছে। দরকার ছিল গুণ ও দোষ দুটোই সামনে রাখা এবং গুণের জন্য প্রশংসার পাশাপাশি ত্রম্নটিকেও নিশানদিহী করে দেওয়া। এটা হত সত্যিকারের আমানতদারি। সে ক্ষেত্রে সতর্ক পাঠক অভিমত ও রচনায় সাযুজ্য পেত। গরমিলের জন্য ধাক্কা খেত না। কিন্তু সেই সাবধানতা অবলম্বন না করায় এবং প্রান্তিকতামূলক প্রশংসাপত্র লিখে দেওয়ায় একদিকে সতর্ক পাঠক হোচট খাচ্ছে, অন্যদিকে যাদের সচেতনতার অভাব বা যারা লেখক বা অভিমতদাতার প্রতি অতি আস্থাশীল তারা হচ্ছে বিভ্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত। এসবই প্রশংসায় বাড়াবাড়ির কুফল। এ কুফল থেকে নিজেকে ও সমাজকে রক্ষা করার জন্য দরকার প্রশংসায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করা ও পরিমিতিবোধের পরিচয় দেওয়া তথা আকাবিরে দ্বীনের মতো অভিমত দানে সতর্কতা অবলম্বন করা, যেমন দ্বীনী রচনাবলীতে তেমনি দুনায়াবী বইপুস্তকের ক্ষেত্রেো।

পণ্য বিজ্ঞপ্তি

‘প্রচারেই প্রসার’ একটি সর্বজনবিদিত মূলনীতি। পণ্যের ক্ষেত্রেই এটা বেশি প্রযুক্ত হয়ে থাকে। পণ্যের ব্যাপক প্রচারের লক্ষ্য উৎপাদক মহল প্রচার-প্রচারণাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এর জন্য বিজ্ঞাপন ও মডেলিংয়ের মত নতুন নতুন শিল্প ও পেশার উদ্ভব ঘটেছে। এর মাধ্যমে পণ্যের গুণকীর্তণ করে ভোক্তাসাধারণকে আকৃষ্ট করাই উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য যখন তাদেরকে আকৃষ্ট করে পণ্যটি তাদের গছিয়ে দেওয়া তাই বাস্তবে সেটি যেমনই হোক না কেন বিজ্ঞাপিত করা হয় অতি উপকারী একটি সংগ্রহযোগ্য বস্তুরূপে। এ পেশায় যারা আত্মনিয়োগ করে, অর্থ বিত্তই যেহেতু তাদের মূখ্য তাই একেকটি পণ্যকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য নিজেদের সবটা ক্ষমতা ঢেলে দেয়। প্রতিযোগিতার বাজারে নিজ নিজ মক্কেলের পণ্যটিই যে সবার সেরা তা প্রতিপন্ন করার জন্য তদসংশ্লিষ্ট যত গুণ আছে সবই তাতে একঠাঁই করার কসরত করে। এ প্রচেষ্টায় যে যতটা দক্ষতা দেখাতে পারে সে ততটা প্রতিষ্ঠা পায়। সেই প্রতিষ্ঠা লাভের উদ্দেশ্যে ভাষা-ভাব-ভংগী ও অভিনয়ের মাধ্যমে পণ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, মনে হয় তার চেয়ে খাসা মাল যেন আর কিছু হতে পারে না। প্রশংসার জগতে বোধ করি এর চেয়ে শিল্পিত (?) ও এর বেশি অতিরঞ্জিত প্রশংসা আর কিছুরই হয় না। এই প্রশংসায় কেবল ভাষাই ব্যবহার হয় না, প্রশংসাকারীর গোটা সত্তাই এতে বিজ্ঞাপনে পরিণত হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রশংসা ও গুণকীর্তন করে যেখানে পৌঁছানো হয়, বাস্তবিকই কি পণ্যটি সেই মানের এবং আসলেই কি সেটি সেই সব গুণের ধারক? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো বিশেষজ্ঞগণ তা স্বীকার করেন না। তাহলে সে প্রশংসা ও প্রচারণা মিথ্যাচারের মধ্যে পড়ে না কি? আজ এই মিথ্যাচারের মাধ্যমে গোটা জাতিকেই তো প্রতারিত করা হচ্ছে। মিথ্যাচার ও প্রতারণা দুটোই গুরুতর মহাপাপ। প্রতারণা যে কতটা গুরুতর গুনাহ তা বোঝার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাবধানবাণীটিই যথেষ্ট যে,
তিনি বলেন, من غشنا فليس منا ‘যে ব্যক্তি আমাদের সাথে প্রতারণা করে সে আমাদের একজন নয়।’
অথচ এই প্রতারণাই আধুনিককালের এক ফ্যাশন ও শিল্পের রূপ ধারণ করেছে আর এর ফাঁদে ফেলে গণমানুষকে যতসব ভেজাল পণ্যের ভোক্তা বানানো হচ্ছে। আজ গণস্বাস্থ্য যে মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন, কে না জানে এই ভেজাল ভোগই তার জন্য বড় দায়ী। এর থেকে মুক্তির জন্য যে পরিব্যাপ্ত সচেতনতা দরকার তার অংশ হিসেবে প্রশংসা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভংগীকে অবশ্যই সামনে নিয়ে আসতে হবে। ভেজাল পণ্যের প্রশংসা অথবা নির্ভেজাল পণ্যেরও অতি প্রশংসা, কিংবা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ অন্যান্য ক্ষতি ও ত্রুটিকে পাশ কাটিয়ে কেবলই গুণকীর্তনের একদেশদর্শিতা যে বহুবিধ পাপের সমষ্টি সেই বোধ যদি মানুষের চেতনায় জাগ্রত হয়ে যায়। তবেই ব্যবহারিক, চারিত্রিক সকল অংগনে হাজারও ক্ষতি থেকে জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে পারে।

 

পরবর্তী অংশ:
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৫

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE