সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৩

সালাত

পূর্বের অংশ:
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-১
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-২

১৮. কেরাত সমাপ্ত হলে কিছুটা বিরাম নিতেন, (যাতে শ্বাস ফিরে আসে) এরপর তাকবীর দিয়ে রুকূতে যেতেন।

১৯. রুকূতে উভয় হাত হাঁটুর উপর এমনভাবে রাখতেন যেন তা ধরে রেখেছেন। অঙ্গুলিসমূহ ফাঁক করে রাখতেন, উভয় হাত পাঁজর থেকে দূরে রাখতেন। মাথা উঁচুও করতেন না, নীচুও করতেন না, বরং পিঠের সমান্তরালে রাখতেন। এত সোজা হত যে, পিঠে পানি ঢেলে দিলে তা স্থির থাকবে । রুকূতে বার বার سبحان ربي العظيم (সুবহানা রাববিয়াল আযিম) বলতেন । কখনো তিনবার বলতেন। রুকূতে কখনো অন্য ধরনের তাসবীহ ও দু‘আ পড়তেন।
রুকূ অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আদায় করতেন এবং বলতেন-
لا تجري صلاة لا يقيم فيها الرجل صلبه في الركوع والسجود
ঐ নামায় যথেষ্ট নয়, যাতে ব্যক্তি রুকূ সেজদায় আপন মেরুদন্ড সোজা করে না। (সুনানে আবু দাউদ , হাদীস -৮৫৫, জামে তিরমিযি , হাদীস- ২৬৫, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস- ৫৯১-৫৯২,৬৬৬)
আরো ইরশাদ করেছেন-اسوء الناس سرقة الذي يسرق من صلاته قالوا يا رسول الله ! وكيف يسرق من صلاته ؟ قال لا يتم ركوعها وسجدوها
নিকৃষ্টতম চুরি হল নামাযে চুরি করা। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! নামাযে কীভাবে চুরি করে? তিনি বললেন, নামাযে রুকূ-সেজদা পূর্ণাঙ্গভাবে করে না। (মুসনাদে আহমাদ, ৫/৩১০, হাদীস-২২১৩৬, সহীহ ইবনে হিব্বান , হাদীস-১৮৮৮)

২০. রুকূ থেকে سمع الله لمن حمده (সামি আল্লাহুলিমান হামীদাহ) বলতে বলতে উঠতেন ও অত্যন্ত শান্তভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন। এরপর ربنا لك الحمد (রাব্বানা লাকাল হামদ) বা    ربنا ولك الحمد (রাব্বানা ওয়ালাকাল হামদ) বা اللهم ربنا ولك الحمد ( আল্লাহুম্মা রাব্বানা  ওয়ালাকাল হামদ) বলতেন। কখনো এর চেয়ে দীর্ঘ তাহমীদও পড়তেন, যথা এক বর্ণনায় নিন্মোক্ত শব্দগুলি উল্লেখিত হয়েছে।
اللهم ربنا لك الحمد ملء السماوات وملء الارض ملء ما شئت من شيء بعد اهل الثناء والمجد احق ما قال العبد وكلنالك عبد لا مانع لما اعطيت ولا معطي ما منعت ولا ينفع ذا الجد منك الجد
(সহীহ মুসলিম, হাদীস-৪৭৭)

২১. কিয়াম থেকে তাকবীর বলতে বলতে সেজদায় যেতেন। প্রথমে হাঁটু, তাপর হাত, এরপর চেহারা ভূমির উপর রাখতেন। কোন কোন বর্ণনায় প্রথমে হাত , তারপর হাঁটু রাখার কথাও এসেছে। কিন্তু অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে তা সহীহ নয়। এ ব্যাপারে কিছুটা মতপার্থক্যও রয়েছে। (ইবনুল কায়্যিম , যাদুল মাআদ ১/২১৫-২২৪; হাবিবুর রহমান আযমী (রহ.) মাকালাতে আবুল মাআসির ১/১৪৯-১৭৪)

২২. সেজদাতে কপাল ও নাক ভালভাবে জমির উপর রাখতেন। চেহারা উভয় হাতের মাঝে এবং উভয় কব্জি কান বরাবর, কখনো কাঁধ বরাবর রাখতেন। উভয় বাহু পাঁজর থেকে দূরে এবং কুনুই জমি থেকে উঁচু রাখতেন, এমনকি নীচ দিয়ে ছাগলছানা অতিক্রম করতে চাইলে অতিক্রম করতে পারতো।
সেজদা সাতটি অঙ্গের উপর ভর দিয়ে করতেন- কপাল এবং নাক, উভয় হাতের পাতা, উভয় হাঁটু ও উভয় পায়ের পাতার প্রান্ত। সেজদায় হাতের আঙ্গুল মিলিত রাখতেন এবং পায়ের অঙ্গুলি কিবলামুখী রাখতেন।
সেজদা অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আদায় করতেন। এক ব্যক্তিকে নামায শিক্ষা দিতে গিয়ে নবীজী বলেন-
إنها لا تتم صلاة احدكم حتى يسبغ الوضوء كما امره الله ثم يكبر الله ويحمده ثم يقرأ من القران ما اذن الله عز وجل له فيه ثم يكبر فيركع فيضع كفيه على ركبتيه حتى تطمئن مفاصله وتسترخى يقول سمع الله لمن حمده فيستوي قائما حتى يقيم صلبه فيأخذ كل عظم مأخذه ثم يكبر فيسجد فيمكن وجهه من الارض حتى تطمئن مفاصله و تسترخى ثم يكبر فيستوي قاعدا على مقعده ويقيم صلبه
“তোমাদের কারো নামায পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ না সে উত্তমরূপে অযূ করবে যেমন আল্লাহ আদেশ করেছেন। এরপর তাকবীর বলবে ও আল্লাহর প্রশংসা করবে (অর্থাৎ সানা পড়বে) এরপর কুরআন থেকে পড়বে , যা আল্লাহ তাআলা তকে তাওফীক দিয়েছেন। এরপর তাকবীর বলে রুকূ করবে। রুকূতে উভয় হাতের পাতা হাঁটুর উপর রাখবে, যতক্ষণ না তার সকল জোড়া স্থির হবে। এরপর سمع الله لمن حمده (সামি আল্লাহুলিমান হামীদাহ) বলে সোজা হয়ে দাঁড়াবে এবং মেরুদন্ড সোজা করবে যাতে সকল হাড় স্ব স্ব স্থানে  স্হির হয়ে যায়। এরপর তাকবীর দিয়ে সোজা হয়ে বসবে এবং মেরুদন্ড খাড়া করবে”। (সুনানে আবু দাউদ , হাদীস-৮৫৮; সুনানে দারেমী হাদীস১৩৩৫)
সেজদায় বারবার سبحان ربي الاعلى (সুবহানা রাব্বিয়াল আ‘লা) পড়তেন। কখনো শুধু তিনবার পড়তেন। নফল নামাযেল সেজদায় দু‘আও করতেন। কোন কোন বর্ণনা অনুযায়ী কখনো ফরয নামাযেও সেজদায় দু‘আ করতেন।

২৩. তাসবীহর পরে তাকবীর বলতে বলতে সেজদা থেকে উঠতেন এবং অত্যন্ত শান্ত হয়ে বসতেন। বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসতেন এবং ডান পা খাড়া রাখতেন। ডান পায়ের অঙ্গুলিসমূহ কেবলামুখী করে রাখতেন। ফরয নামাযে এ সময় কী পড়তেন, এ ব্যাপারে আমাদের জানা মতে হাদীসের বর্ণনাসমূহ নিরব। নফল নামাযে নিন্মোক্ত দুআটি পড়তেন-
اللهم اغفر لي وارحمني واجبرني (وارفعني) واهدني (وعافني وارزقني)
অথবা رب اغفر لي رب اغفرلي পড়তেন। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস – ১১৪৫, সুনানে আবু দাউদ , হাদীস ৮৭৪, সুনানে ইবনে মাজা, হাদীস ৮৯৭)
সাধারণ রীতি অনুযায়ী মনে হয় যে, ফরয নমাযেও উপরোক্ত দু‘আ বা এ জাতীয় কোন দু‘আ পড়তেন। কেননা নামাযের কোন রোকন বা কোন কাজ যিকিরশূন্য রাখা তাঁর রীতির বিরোধী কাজ।

২৪. জলসা- এর পর প্রথম সেজদার মত দ্বিতীয় সেজদা করতেন। এরপর তাকবীর বলতে বলতে দ্বিতীয় রাকাআতের জন্য সোজা দাঁড়িয়ে যেতেন। সেজদা তেকে ওঠার সময় প্রথমে মাথা এরপর হাত এরপর হাঁটু ওঠাতেন। ওঠার সময় জমিনে ভর দিতেন না। উরুর উপর ভর দিয়ে সোজা দাঁড়িয়ে যেতেন এবং প্রথম বা তৃতীয় রাকাতে দ্বিতীয় সেজদার পরে বসতেন না। এটাই তাঁর সাধারণ রীতি ছিল। কোন কোন বর্ণনায় দ্বিতীয় সেজদার পরে বসার কথা উল্লেখ আছে এবং ওঠার সময় (জমিতে) ভর দিয়ে ওঠার কথাও উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ক সকল হাদীস ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদির সমষ্টিগত বিচারে প্রতীয়মান হয় যে, তা কখনো ওযরবশত হয়ে থাকবে। (ইবনুল কায়্যিম , যাদুল মাআদ ১/২৩২-২৩৪, ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া ২২/৪৫১; আল বানূরী, মাআরিফুস সুনান ৩/৭৮-৮১)

২৫. রুকুতে যাওয়ার সময় রুকূ থেকে উঠে এবং প্রথম বৈঠক থেকে উঠে  দ্বিতীয় রাকাতের শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন কিন না বা তাকবীরে তাহরীমা ব্যতীত অন্য কোথাও হাত ওঠাতেন কি না এ ব্যাপারে হাদীসের বর্ণনাসমূহ বিভিন্ন ধরনের। সারসংক্ষেপ হল, তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া অন্য কোথাও রাফয়ে ইয়াদাইন না করাও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং তাকবীরে তাহরীমা ছাড়া নামাযের কিছু ক্ষেত্রে বিশেষত রুকূতে যেতে এবং রুকূ থেকে উঠতে রাফয়ে ইয়াদাইন করাও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
এখন দেখার বিষয় হল, উভয় রীতিই সুন্নাত নাকি একটি সুন্নাত অপরটি কখনো কখনো বৈধতা বোঝানোর জন্য করা হত। এর সমাধান দেয়া ফিকহের ইমামগণের কাজ এবং তারা তা সুন্দরভাবে করে গিয়েছেন। রাফয়ে ইয়াদাইন না করা সুন্নাত হওয়ার বা এটাই মৌলিক সুন্নাত হওয়ার ব্যাপারে একটি বড় আলামত হল খাইরুল কুরূনে এ অনুযায়ী আমল বেশি ছিল। খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে হযরত উমর (রাযি.) ও হযরত আলী (রাযি.) থেকে তা-ই প্রমাণিত ।এই দুই জন থেকে সহীহ সনদে রাফয়ে ইয়াদাইন প্রমাণিত নয়। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীদের মধ্যে অধিকাংশ ফকীহগণের আমলও তাই ছিল। বয়োজ্যোষ্ঠ সাহাবায়ে কেরাম যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে প্রথম কাতারের নিয়মিত মুসল্লী ছিলেন তাঁদের আমলও তাই ছিল।
কোন কোন ইমাম বিভিন্ন কারণে রাফয়ে ইয়াদাইন করাকে সুন্নাত বলেছেন, তবে সকল ইমামের মতে রাফয়ে ইয়াদাইন করা বা নাকরা উভয়টিই জায়েয। আলোচনা শুধু উত্তম অনুত্তমের ব্যাপারে। (ইবনে তাইমমিয়া, রিসালাতুল উলফাহ বাইনাল মুসলিমীন-৫৫-৫৬;) ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মাআদ১/২৬৬ ইবনে দাকীকুল ঈদ, আল ইমাম ফী মারিফাতি আহাদীসিল আহকাম আযযাইলায়ী, নাসবুর রায়া ১/৩৯৩, কাশ্মীরী, নাইলুল ফারকাদাইন, ফী মাসআলাতি রাফয়িল য়াদাইন, বাসতুল য়াদাইন লিনাইলিল ফারকাদান, আল বানুরী, মাআরিফুস সুনান, শরহু জামিয়িত তিরমিযী ২/৪৫১-৫০১; উৎসমানী, ইলাউৎস সুনান ৩/৫৬-৯১, কাউৎসারী, আননুকাতুত তরীফাহ (ভুমিকা) আলইমাম মুহাম্মদ ইবনুল হাসান শাইবানী, কিতাবুল হুজ্জাহ আলা-আহলিল মাদিনা-২৩)

 

পরবর্তী অংশ:

সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৪

2 Comments

  1. Pingback: সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৪ | ইসলাম বার্তা

  2. Pingback: সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-১ | ইসলাম বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE