জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-২

পূর্ববর্তী অংশ=
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-১

শায়খ আলবানী রাহ.-এর তাহকীক ও পর্যালোচনা: 

উম্মে ফারওয়া রা.-এর হাদীসটির সনদ শায়খ আলবানীর মতেও যঈফ। তিনি সুনানে আবূ দাউদে হাদীসটির উপর আলোচনা করতে গিয়ে বলেন :

و هذا سند ضعيف، عبد الله بن عمر – هو العمرى المكبر- وهو سيئ الحفظ

(এটি যঈফ সনদ। আব্দুল্লাহ ইবন উমর হচ্ছেন আল-উমারী । তিনি দুর্বল স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন।) এরপর তিনি হাদীসটির ইযতিরাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার পর লেখেন:

وهذا اضطراب شديد مما يزيد فى ضعف الاسناد

(এটা মারাত্মক ইযতিরাব যা হাদীসের সনদকে আরও দুর্বল করে দেয়) অর্থাৎ শায়খ আলবানী বলতে চাচ্ছেন, একে তো যঈফ রাবীর কারণে হাদীসের সনদটি যঈফ, তদুপরি এতে রয়েছে নানারকম ইযতিরাব যা হাদীসের সনদকে আরও যঈফ ও দুর্বল করে দেয়। এতদসত্ত্বেও আমাদের আলোচ্য বইয়ের লেখক বলে দিলেন, ‘সনদ সহীহ’। হাঁ উম্মে ফারওয়ার হাদীসটি হাকেম কর্তৃক বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইব্ন মাসউদ রা.-এর হাদীস দ্বারা সমর্থিত বলে মনে করার কারণে আলবানী রাহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। অর্থাৎ তাঁর মতে হাদীসটি সহীহ লিগাইরিহী। কোনো হাদীস অন্য হাদীস দ্বারা সমর্থিত হওয়ার কারণে সহীহ লি-গাইরিহী হওয়া আর সেই হাদীসটির সনদ সহীহ হওয়া এক কথা নয়। বিষয়টি সাধারণ তালিবুল ইলমও জানে। লেখক কেন বিষয়টি জানলেন না তা বোঝা গেল না।

উম্মে ফারওয়া রা.-এর হাদীসটি কি সহীহ, যেমনটা আলবানী রাহ. বলেছেন?

আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রা. কর্তৃক বর্ণিত মুস্তাদরাকে হাকেমের যে হাদীসটির কারণে উম্মে ফারওয়া রা. -এর হাদীসটিকে শায়খ আলবানী রাহ. সহীহ বলেছেন সেটি যঈফ। কারণ : বর্ণনাটি শায বা দল-বিচ্ছিন্ন বর্ণনা। এর বিস্তারিত বিবরণ এই যে, হাকেম হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন এইভাবে:

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ عِيسَى ، فِي آخَرِينَ ، قَالُوا : حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرٍ مُحَمَّدُ بْنُ إِسْحَاقَ ، حَدَّثَنَا بُنْدَارٌ ، حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ عُمَرَ ، حَدَّثَنَا مَالِكُ بْنُ مِغْوَلٍ ، عَنِ الْوَلِيدِ بْنِ الْعَيْزَارِ ، عَنْ أَبِي عَمْرٍو الشَّيْبَانِيِّ ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ ، قَالَ : سَأَلْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَيُّ الْعَمَلِ أَفْضَلُ ؟ قَالَ : الصَّلاَةُ فِي أَوَّلِ وَقْتِهَا

এই হাদীসটিকেই ইমাম বুখারী রাহ. ভিন্ন শব্দে তাঁর গ্রন্থে গ্রন্থাবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন:

حَدَّثَنَا أَبُو الْوَلِيدِ هِشَامُ بْنُ عَبْدِ الْمَلِكِ قَالَ : حَدَّثَنَا شُعْبَةُ قَالَ الْوَلِيدُ بْنُ الْعَيْزَارِ ، أَخْبَرَنِي قَالَ : سَمِعْتُ أَبَا عَمْرٍو الشَّيْبَانِيَّ يَقُولُ ، حَدَّثَنَا صَاحِبُ هَذِهِ الدَّارِ وَأَشَارَ إِلَى دَارِ عَبْدِ اللهِ ، قَالَ : سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الْعَمَلِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ قَالَ الصَّلاَةُ عَلَى وَقْتِهَا قَالَ ثُمَّ أَيُّ قَالَ ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ قَالَ ثُمَّ أَيُّ قَالَ الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ ، قَالَ : حَدَّثَنِي بِهِنَّ وَلَوِ اسْتَزَدْتُهُ لَزَادَنِ

(হাদীস নং-৫২৭)

লক্ষ করুন বুখারীর বর্ণনায় শব্দ রয়েছে الصلاة على وقتها আর হাকেমের বর্ণনায় রয়েছে الصلاة فى أول وقتها । দুটি কথা সম্পূর্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। সে কথায় পরে আসছি। বুখারী রাহ. হাদীসটিকে শু‘বার সনদে উল্লেখ করেছেন। শু‘বার সকল শাগরেদ হাদীসটিকে الصلاة على وقتها শব্দেই বর্ণনা করেছেন। শুধু তাঁর একজন শাগরেদের বর্ণনায় الصلاة فى أول وقتها পাওয়া যায়। তিনি হলেন আলী ইব্ন হাফস। আলী ইব্ন হাফস কর্তৃক বর্ণিত الصلاة فى أول وقتها শব্দ সম্বলিত হাদীসটি হাকেম, বায়হাকী ও দারা কুতনী তাঁদের স্ব স্ব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। আলী ইব্ন হাফস সম্পর্কে দারা কুতনী মন্তব্য করেছেন এই বলে- ما احسبه حفظه لانه كبر وتغير حفظه (আমি মনে করি না আলী ইব্ন হাফস হাদীসটিকে যথাযথ সংরক্ষণ করেছেন। কেননা, তিনি বৃদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং তাঁর স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন ঘটেছিল।)

আরেকটি সনদে হাদীসটি الصلاة فى أول وقتها শব্দে বর্ণিত হয়েছে। সনদটি এরূপ-

الحسن بن على المعمرى عن ابى موسى محمد بن المثنى عن غندر عن شعبة

কিন্তু আবূ মূসার শাগরেদদের মধ্য হতে হাসান ইবন আলী ব্যতীত আর কেউ হাদীসটিকে ঐ শব্দে বর্ণনা করেন না। বরং তাঁর সকল শাগরেদ তাঁর বরাতে الصلاة على وقتها শব্দেই বর্ণনা করেন। দারা কুতনী রাহ. এমনটাই বলেছেন। তিনি বলেন,

تفرد به المعمرى فقد رواه أصحاب أبي موسى بلفظ الصلاة على وقتها

(অর্থাৎ আল-মা‘মারী এইরূপ একাই বর্ণনা করেছেন। আবূ মূসার সকল শাগরেদ হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন الصلاة على وقتها শব্দে।) এই মন্তব্যের পরে দারা কুতনী রাহ. আবূ মূসার অপর এক শাগরেদ মাহামিলীর বরাতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন الصلاة على وقتها শব্দে। ঠিক যেমনটা আবূ মূসার অন্যান্য শাগরেদগণ বর্ণনা করেন। আবূ মূসার ন্যায় গুনদারের সকল শাগরেদ হাদীসটিকে الصلاة على وقتها শব্দেই বর্ণনা করেন। হাফেয ইবন হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, প্রকাশ্যত এটাই বোঝা যায় যে, হাসান ইবন আলী আল-মা‘মারী তাঁর বর্ণনায় ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। কারণ, তিনি তাঁর স্মৃতি থেকে হাদীস বর্ণনা করতেন।

বাকী রইল মুস্তাদরাকে হাকেমের উপরিউক্ত ঐ বর্ণনাটি যার দ্বারা উম্মে ফারওয়ার হাদীসটি সমর্থিত বলে শায়খ আলবানী রাহ. মনে করেন। হাদীসটি সম্পর্কে বক্তব্য হল, হাদীসটি মালেক ইবন মিগ্ওয়ালের শাগরেদদের মধ্য হতে একমাত্র উসমান ইব্ন উমার ব্যতীত আর কেউ الصلاة فى أول وقتها শব্দে বর্ণনা করেন না। তাঁর সকল শাগরেদ তাঁর বরাতে হাদীসটিকে الصلاة على وقتها শব্দেই বর্ণনা করেন। হাফেজ ইবন হাজার আসকালানী রাহ. বলেন, وتفرد عثمان بذلك’ والمعروف عن مالك بن مغول كرواية الجماعة

(অর্থাৎ এইরূপ বর্ণনায় উসমান নিঃসঙ্গ। মালেক ইবন মিগ্ওয়াল হতে যা প্রসিদ্ধ তা হল الصلاة على وقتها শব্দে অন্যান্য সকলের অনুরূপ বর্ণনা।)

আপনি বলতে পারেন যে, হাকেম তো হাদীসটিকে على شرط الشيخين তথা বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের মানে উত্তীর্ণ বলে ব্যক্ত করেছেন।

এর জবাবে বলব যে, على شرط الشيخين কথাটি কোন্ হাদীসের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় বা করা হয় তা নিয়ে বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন, কোনো হাদীসের সনদে উল্লেখকৃত রাবীগণের সকলেই যদি বুখারী ও মুসলিমের রাবী হন তাহলে সেই হাদীস সম্পর্কে বলা যায় যে, তা على شرط الشيخين বা বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের মানসম্পন্ন। কেউ বলেন, যে হাদীসটির সনদ হুবহু বুখারী ও মুসলিমের সনদ সেই হাদীস সম্পর্কে বলা যায় যে, তা على شرط الشيخين । কেউ বলেন, বুখারী ও মুসলিমের রাবীগণ যে সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর অধিকারী সেই সকল বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর অধিকারী রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে বলা যায় যে, তা على شرط الشيخين ।
দ্বিতীয় মতটিই অধিকতর বিশুদ্ধ বলে মনে হয়। এর কারণ কী সে আলোচনা এখানে নিষ্প্রয়োজন। তবে সবকটি মতের সার কথা হল, যে হাদীসটিকে على شرط الشيخين বা বুখারী ও মুসলিমের হাদীসের মানে উত্তীর্ণ বলে ব্যক্ত করা হয় তার রাবীগণ উচ্চমান সম্পন্ন সত্যবাদি ও বিশ্বস্ত। কিন্তু কোন হাদীস সহীহ ও দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য রাবীগণের সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি গুণই যথেষ্ট নয়। বরং তাঁদের বর্ণনাটি শায বা দল-বিচ্ছিন্ন না হওয়াও জরুরী। এটি একটি স্বীকৃত মূলনীতি। দল বিচ্ছিন্নতা হাদীস সহীহ হওয়ার পথে একটি বড় বাধা। হাকেমের হাদীসটি এই বাধাকে অতিক্রম করতে পারেনি। কেননা পূর্বেই আমরা দেখিয়েছি যে, الصلاة فى أول وقتها শব্দে হাদীসটি বর্ণনার ক্ষেত্রে উসমান ইব্ন উমার নিঃসঙ্গ। তাঁর উস্তায মালেক ইবন মিগ্ওয়ালের শাগরেদগণের কেউই হাদীসটিকে ঐ শব্দে বর্ণনা করেন না।

সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও যে সকল রাবী হাদীসটিকে الصلاة على وقتها -এর স্থলে الصلاة فى أول وقتها শব্দে বর্ণনা করেছেন তাঁদের কেউবা স্মৃতি দুর্বলতার শিকার হয়েছেন, আর কেউ সম্ভবত কথা দুটোর অর্থ অভিন্ন বলে ধারণা করে الصلاة على وقتها -এর স্থলে الصلاة فى أول وقتها বর্ণনা করেছেন। হাফেজ ইব্ন হাজার আসকালানী রাহ. বলেন,وكأن من رواها كذالك ظن ان المعنى واحد (যারা হাদীসটিকে এইভাবে বর্ণনা করেছেন তারা হয়তো মনে করেছেন যে, উভয়টির অর্থ এক।) শায়খ আলবানীও (রাহ.) কথা দুটোর অর্থ অভিন্ন বলে ধারণা পোষণ করেন। কেননা তিনি হাকেমের হাদীসের উদ্ধৃতি দেওয়ার পর বলেন: وهو فى الصحيحين وغيرهما بلفظ ,على وقتها، والمعنى واحد عندنا (সহীহাঈন ও অন্যান্য গ্রন্থে হাদীসটি على وقتها শব্দে বর্ণিত হয়েছে। আমাদের মতে অর্থ একই।) শায়খ আলবানীর সঙ্গে এ ক্ষেত্রে আমি সহমত পোষণ করি না।

কারণ, দ্বিতীয় কথাটির অর্থ হল, ওয়াক্তের শুরুতে সালাত আদায় করা। আর প্রথম কথাটির স্পষ্ট অর্থ হল, সময়মত সালাত আদায় করা। অর্থাৎ সালাতকে তার ওয়াক্তচ্যুত না করা। প্রতিটি সালাতের শুরু ও শেষের যে নির্ধারিত ওয়াক্ত আছে সেই ওয়াক্তের মধ্যেই সালাত আদায় করা। কাযা না করা।

 

পরবর্তী অংশসমূহ=
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৩
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৪

জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৫
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৬
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৭
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৮
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-৯
জাল হাদীসের কবলে রাসূলের সালাত নাকি মুযাফ্ফরের কবলে-১০

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE