প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -২

পূর্ববর্তী অংশসমূহ:
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -১

তাছাড়া এটা এক রকম মিথ্যাকথনও বটে। কেননা যেখানে কুরআন মজীদ বলছে আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানে না, সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি ভূত-ভবিষ্যতের সবকিছু জানেন বলে দাবি করা মিথ্যা নয়ত কী? সুতরাং প্রশংসার উপযুক্ততা নির্ণয়ের একটা মাপকাঠি সত্যানুগতাও। অর্থাৎ কারও প্রশংসা করার সময় এদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে যে, সে প্রশংসা বাস্তবসম্মত কি না? যে কথা বলা হচ্ছে তা আসলেই সেই ব্যক্তির মধ্যে আছে কি না?

বর্তমানকালে চারদিকে অসত্য প্রশংসার ছড়াছড়ি। এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি আর সব সীমালংঘনকে ছাড়িয়ে গেছে। জীবিত ও মৃত কেউ এই বাড়াবাড়ির অত্যাচার থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। মৃত ব্যক্তির প্রশংসার অতিরঞ্জন তুলনামূলক সহজ ও নিরাপদ। তার সত্যতা যাচাই অপেক্ষাকৃত কঠিন। তাই মৃত ব্যক্তির ভক্তকুল তার গুণগানের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। প্রত্যেকের চেষ্টা সকলকে ছাড়িয়ে তাকে কত উচ্চে তোলা যায়। এজন্য আজগুবি ও অবিশ্বাস্য গল্প বানাতেও ছাড়ে না। একবারও চিন্তা করা হয় না এসব বানোয়াট প্রশংসা তার নিজের জন্য তো বটেই, মৃতপ্রশংসিতেরও কতটা ক্ষতিরর কারণ হচ্ছে।
হাদীস শরীফে আছে, কেউ মারা যাওয়ার পর শোকার্ত লোকেরা যদি তার গুণগান করে কাঁদে তবে ফিরিশতাগণ তাকে এই বলে তিরস্কার করে যে, তুমি কি এরকমই ছিলে নাকি?
অন্যকোনও বর্ণনায় আছে, সে কারণে গুনকীর্তনই যখন মৃত ব্যক্তির ক্ষতির কারণ হয়, তখন যারা ঠাণ্ডা মাথায় বুঝে-শুনে অতিরঞ্জন করে তারা তার কী উপকারটা করছে? ভক্ত-অনুরক্তদের অমূলক বাড়াবাড়ি তো হযরত ঈসা আলাআহিস সালামের মত মহান পয়গম্বরকেও কৈফিয়তের সন্মুখীন করবে
কুরআন মাজীদে আছে, আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে বলবেন, ‘হে ঈসা ইবনে মারয়াম! তুমিই কি মানুষকে বলেছ যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার মাকেও উপাস্যরূপে গ্রহণ কর?’ (মায়িদা : ১১৬)
যদিও হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে সক্ষম হবেন, কিন্তু আল্লাহ তাআলার পাশাপাশি উপাসিত হওয়ার জন্য তাঁর দরবারে কৈফিয়তের সম্মুখীন হওয়াটা একটা লজ্জার বিষয় তো বটে! এর দ্বারা মৃত বুযুর্গদের অনুসারী এবং রাষ্ট্র ও দলনেতা বা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিবর্গের ভক্ত-অনুরক্তদের সবক নেওয়ার দরকার রয়েছে। তারা তো প্রশংসা করে করে তাদের প্রিয় ব্যক্তিত্বকে আসমানে তুলছে, কিন্তু আসমানী আদালতে সেজন্য তাদেরকে কি কঠিন লজ্জার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তা কি একবারও চিন্তা করছে?

প্রশংসার বাড়াবাড়ি হয় জীবিতদের বেলায়ও। তা উৎকটভাবে হয় দ্বীনী বা দুনিয়াবী নেতৃবর্গের ক্ষেত্রে। উদ্দেশ্য থাকে তাদের নৈকট্য অর্জন করা এবং বেশিরভাগেরই পরম লক্ষ্য কোনো অন্যায় সুবিধা ভোগ করা। এর জন্য প্রশংসার আদলে যা করা হয় তা নিছক তোষামোদ ও চাটুকারিতা। তার সাথে না থাকে ভক্তি-ভালবাসার কোন সম্পর্ক এবং না কোনওরূপ সত্যনিষ্ঠা। কিছু সুবিধা পাওয়া যাবে সেই আশায় নেতৃপর্যায়ের লোকের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয় এবং তাদের খুশি করার জন্য এমনসব বিশেষণে তাদেরকে বিশেষিত করা হয়, বাস্তবে যার ছিটে-ফোঁটাও তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকে না। জ্ঞানতাপস, শিক্ষানুরাগী, জনদরদী প্রভৃতি গুনাবলীর গালভরা উচ্চারণে যাদেরকে ফোলানো হয়, লেখাপড়ার ধার তারা ঠিক কতটুকু ধারে? আর্ত-মানবতার বেদনায় তারা কতখানি ব্যথিত হয়? গণমানুষের জ্ঞান-বিমুখতা ও দু:খ-দুর্দশায় যারা সর্বাপেক্ষা বেশি দায়ী, তাদের পক্ষে এ জাতীয় স্তাবকতাকে স্বার্থের ধান্ধা ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি? সুতরাং এরকম প্রশংসা কেবল মিথ্যাচারই নয়, কপটতা ও মতলববাজিও। এর অবৈধতা ব্যাখ্যা করে বোঝানোর দরকার পড়ে না। তাই এটা আমাদের আলোচনার বিষয়ও নয়। আমাদের আলোচনা সেই প্রশংসা সম্পর্কে, যা সত্যিকারের মুগ্ধতা থেকে উৎসারিত।

দ্বীনী বা দুনিয়াবী নেতৃবর্গের প্রতি মুগ্ধতাজাত ভক্তি থেকে যে প্রশংসা উচ্চারিত হয়, তার বৈধতার জন্যও সত্যনিষ্ঠা জরম্নরি। অর্থাৎ প্রশংসা কেবল অকপট হওয়াই যথেষ্ট নয়, বাস্তবসম্মতও হতে হবে। ভক্তজনদের অনেক সময়ই সেদিকে লক্ষ্য থাকে না। ভক্তির আতিশয্যে তারা মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেলে। দৃষ্টি থাকে কেবলই প্রশংসার দিকে। বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা থাকে না। ফলে যা-ই বলা হয় বাড়িয়ে বলা হয় এবং ক্ষেত্র বিশেষে বানিয়েও বলা হয়। অর্থাৎ কেবল তিলকেই তাল করা হয় না, জিরোকেও হিরো করে তোলা হয়ে যায়। উভয় অবস্থায়ই কমবেশি অসত্য কথন তো হয়ই, কিন্তু প্রশংসার বাতাবরণে সে অনুভূতি আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আর এভাবে নিজেকে অহেতুক গুনাহগার বানানো হয়। এই অহেতুক গুনাহে উম্মত যাতে লিপ্ত না হয়।

তাই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিক নির্দেশনা দান করেন-

إذا كان أحدكم مادحا صاحبه لامحالة، فليقل : احسب فلانا والله حسيبه، ولا ازكى على الله أحدا، احسبه -ان كان يعلم ذاك- كذا وكذا
তোমাদের কেউ যখন তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রশংসা করবেই তখন তার সম্পর্কে যেন কেবল এতটুকুই বলে যে, ‘আমি অমুককে এমন-এমন মনে করি, তবে বাস্তবে সে কেমন সে হিসাব আল্লাহ তাআলার কাছেই আছে, আমি আল্লাহর জ্ঞানের বিপরীতে কারও সাফাই দিচ্ছি না। এটাও বলবে কেবল তখনই যখন তার সম্পর্কে সেরকম জানা থাকে।
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩০০০ )

চিন্তা করে দেখুন, কী কঠিন সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। এক তো প্রশংসা করা যাবে কেবল এমন বিষয়ে যা জানা আছে, অজ্ঞাত বা আনুমানিক বিষয়ে কিছুতেই নয়। দ্বিতীয়ত জানা বিষয়েও নিশ্চয়তাবোধক শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। যেমন, তিনি একজন আমানতদার লোক, ‘অমুক ব্যক্তি পরহেযগার’ ইত্যাদি। বরং বলতে হবে, আমি তাকে পরহেজগার মনে করি বা আমার জানামতে সে একজন আমানতদার ইত্যাদি। তারপরও প্রকৃত অবস্থাকে আল্লাহ তাআলার উপরই ন্যস্ত করতে হবে। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান তাঁরই আছে, আমরা অতি সামান্যই জানি।

এ হাদীসে যে والله حسيبه (আল্লাহ তাআলাই তার প্রকৃত অবস্থার হিসাব গ্রহণকারী) বলার তালীম দেওয়া হয়েছে, এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এর দ্বারা যেমন সতর্ক করা হয়েছে, সে যেন অসত্য কিছু না বলে, তেমনি প্রশংসা দ্বারা প্রশংসিত ব্যক্তির যে ক্ষতি হতে পারে সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার প্রতিকারেরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রশংসা দ্বারা প্রশংসিত ব্যক্তির অন্তরে অহংকার অহমিকা জন্মানোর অবকাশ থাকে আর বাস্তবিকই যদি তা জন্ম নিয়ে ফেলে তবে তো প্রশংসা দ্বারা তার মস্তবড় ক্ষতি করে ফেলা হল। সুতরাং হে প্রশংসাকারী! তুমি তোমার প্রশংসায় সীমালংঘন তো করবেই না, অধিকন্তু তোমার জানামতেও যে প্রশংসা করবে, তার সত্যাসত্যও আল্লাহর উপর ন্যস্ত করবে। যাতে প্রশংসিত ব্যক্তির অন্তরে আত্মতুষ্টি জন্ম নিতে না পারে এবং ‘কিছু একটা বনে গেছে’-এই অহংবোধের শিকার না হয়ে পড়ে।

মানুষ যখন আত্মতুষ্টি ও আত্মম্ভরিতার শিকার হয়ে পড়ে তখন তার অগ্রগতি আপনা-আপনিই থেমে যায়। নেতৃস্থানীয় হলেই সে যে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গেছে এমন তো নয়; দ্বীনের পথে উন্নতির কোন শেষ নেই। তাই পরিতুষ্টিরও কোন অবকাশ নেই। পরিতুষ্টি কেবল উন্নতিকেই ব্যাহত করে না, অবনতিকেও ত্বরান্বিত করে। কেননা গতিশীলতা সৃষ্টির ধর্ম। তাকে উর্ধ্বমুখী না রাখলে অধ:গামী হবেই। পরিতুষ্ট ব্যক্তি কখনও বাড়তি অর্জনের চেষ্টা করে না, ফলে অর্জিত ধনও ক্ষয়ে যেতে শুরু করে। সেই সংগে দেখা দেয় আত্মগর্বের সর্বনাশা ব্যধি। যা তার যাবতীয় সদগুনকেও ধ্বংস করে দেয়। প্রশংসিত ব্যক্তিকে সেই সর্বনাশ থেকে রক্ষা করার জন্যই কিছু বনে যাওয়ার ধারণা তাকে না দেওয়া এবং তার প্রকৃত অবস্থাকে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া অবশ্য কর্তব্য।

বলাবাহুল্য উচ্চ প্রশংসার এ ক্ষতি কেবল নেতৃস্থানীয়দেরই হিস্যা নয়। সাধারণ শ্রেণীও এর আওতায় পড়ে যায়। সমস্তরের লোক কিংবা বিশিষ্টদের পর্যায়ে পৌঁছায়নি এমন লোকের প্রশংসায়ও সীমা রক্ষা করা উচিত। এমনকি ছোটদের পিঠ চাপড়ানি দিতেও তা তাকে আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত করবে কি না সেদিকে লক্ষ্য রাখা কর্তব্য। ব্যক্তি যদি আত্মশক্তিতে বলিয়ান না হয়, তাকওয়া-পরহেযগারিতে যত্নবান না থাকে এবং নিজ অবস্থা সম্পর্কেও যথেষ্ট সচেতন না থাকে, তবে কেবল উচ্চ প্রশংসাই নয়, স্বাভাবিক প্রশংসাও তার অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করতে পারে। একারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এক ব্যক্তি অন্য একজনের প্রশংসা করলে তিনি তাকে ধিক্কার দিয়ে বললেন, (অর্থ) তুমি তো লোকটার মেরুদণ্ড ভেংগে দিলে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৩০০০)। কাজেই প্রশংসা বৈধ হওয়ার জন্য প্রশংসিত ব্যক্তির ক্ষতি হয়ে যায় কি না সে দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখাও শর্ত।

 

পরবর্তী অংশসমূহ:
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৩
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৪
প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৫

1 Comment

  1. Pingback: প্রশংসার ক্ষেত্রে ইসলামে মধ্যপন্থা ও পরিমিতিবোধের গুরুত্ব -৫ - ইসলাম বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE