সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-১

নামাজ আদায়

আমাদের সমাজে নামায আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ আছে।নিচে সহীদ হাদীসের দলিলের আলোকে হুজুর সাল্লাল্লাজু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিভাবে নামায আদায় করতেন এবং আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন তা আলোচনা করা হবে। উল্লেখ্য নারী-পুরুষের সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে যে পার্থক্যগুলো আছে তা এইখানে আলোচনা করা হয়নি।
নামায আদায়ের নববী-পদ্ধতি:
১. নিয়ত করা:
নামাযের সর্বপ্রথম ফরয হলো নিয়ত খালেস করা, শুধু আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে নামায আদায় করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إنما الاعمال بانيات وإنما لامرئ ما نوى فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله فهجرته إلى الله ورسوله ومن كانت هجرته إلى دنيا يصيبها أو امرأة ينكحها فهجرته الى ما هاجر إليه
“আমলের ফলাফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকে তার নিয়ত অনুযায়ী আমলের ফলাফল পাবে। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলকে সন্তুষ্ট করার জন্য হিজরত করবে সে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি পাবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি দুনিয়া উপার্জন বা কোন মহিলাকে বিবাহ করার জন্য হিজরত করবে তার হিজরত সে জন্যই সাব্যস্ত হবে”। (বুখারী ও মুসলিম)
নিয়ত হল অন্তরের সংকল্প। অর্থাৎ এমন সংকল্প করা যে, আমি ফজরের ফরয বা যোহরের ফরয পড়ছি। এর উচ্চারণ জরুরি নয়। অন্তরের সংকল্প ছাড়া শুধু মুখের উচ্চারণে নিয়ত আদায় হয় না। এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম থেকে মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা প্রমাণিত নয়। তাই মুখে নিয়ত করাকে সুন্নাত বলা ভুল। তবে অন্তরের সংকল্পের পাশাপাশি মুখের নিয়তের ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞাও নেই । কিন্তু আরবি ভাষায় নিয়ত করাকে সাওযাবের কাজ মনে করা নিতান্তই ভুল এবং প্রচলিত লম্বা আরবী নিয়ত করতে গিয়ে তাকবীরে উলা থেকে বঞ্চিত হওয়া বা জোরে জোরে উচ্চারণ করে অন্যের মনোযোগ নষ্ট করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
(ইবনে তাইময়া , আলফাতাওয়াল কুবরা ১/২৭৭-২৯০, ইবনে নুজাইম, আল বাহরুর রায়েক ১/২৭৭)

২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাযের উদ্দেশ্যে দাঁড়াতেন তখন আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করতেন।

৩. তাকবীর বলার সময় উভয় হাত কানের লতি পর্যন্ত উঠাতেন এবং উঠানোর সময় হাতের অঙ্গুলিসমূহ খোলা (ও কেবলামুখী করে) রাখতেন।
(সহীহ মুসলিম ২/২৬৯, ২৯১, হাদীস – ৩৯১,৪০১, জামে তিরমিযী ২/৫, হাদীস- ২৩৯)
সাহীহ হাদীসে উভয় হাত কাঁধ পর্যন্ত ওঠানোর কথাও বর্ণিত হয়েছে এবং তা কোন কোন ইমামের মতে সুন্নাতও বটে। কিন্তু সেই হাদিসেল ব্যাখ্যা সম্ভবত হযরত ওয়ায়েল (রাযি.) বর্ণিত হাদীস দ্বারা হয়ে যায়, যা সুনানে আবু দাউদে নিন্মোক্ত শব্দে বর্ণিত হয়েছে।
إنه ابصر النبي صلى الله عليه وسلم حين قام إلى الصلاة رفع يديه حتى كانتا بحيال منكبيه وحاذى بابهاميه اذنيه ثم كبر
তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেন যে, তিনি যখন নামাযে দাঁড়ালেন তখন উভয় হাত এভাবে উঁচু করলেন যে, উভয় হাত কাঁধ বরাবর এবং উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলি কান বরাবর হয়ে গেল, এরপর তাকবীর দিলেন। (সুনানে আবু দাউদ ১/ ৪৮২, হাদীস-৭২৫)
বোঝা গেল শুধু কাঁধ পর্যন্ত ওঠানো উদ্দেশ্য নয় বরং এভাবে উঠাতে হবে যাতে উভয় বৃদ্ধাঙ্গুলি কানের লতি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আবার এও হতে পারে যে, কাঁধ পর্যন্ত ওঠানোও একটি মাসনূন পদ্ধতি।

৪. তাকবীরের পরে ডান হাত বাম হাতের উপর (অর্থাৎ ডান হাতের কব্জি বাম হাতের কব্জির উপর) রেখে হাত বাঁধতেন। (শাওকানী, নাইলুল আওতার- ২/ ১৮৮)।  হাত কোথায় বাঁধতেন তা ইমাম তিরমিযী (রহ.) নিন্মেক্ত বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয়। তিনি বলেন,

والعمل على هذا عند اهل العلم من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم والتابعين ومن بعدهم يرون أن يضع الرجل يمينه على شماله في الصلاة ورأى بعضهم أن يضعها فوق السرة ورأى بعضهم أن يضعها تحت السرة وكل ذالك واسع عندهم

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, তাবেয়ী ও পরবর্তী আহলে ইলমের কর্মধারা এমনই । অর্থাৎ তাঁরা নামাযে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখাকে নামাযের নিয়ম মনে করতেন। তাঁদের কতক নাভির উপরে এবং কতক নাভির নীচে রাখাকে উত্তম মনে করতেন। তবে উভয় পদ্ধতিই তাঁদের সকলের মতে বৈধ ছিল। (জামে তিরমিযী ২/৩৩, হাদীস-২৫২- এর আলোচনায়)
সাহাবী ও তাবেয়ীগণের আমল থেকে বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নাভির নীচে হাত বাঁধতেন, কখনো নাভির উপরে। কিন্তু বুকে হাত বাঁধার কথা কোনো সহীহ হাদীসে নেই এবং তা কোন সাহাবী বা তাবেয়ীর আমল দ্বারাও প্রমাণিত নয়। তাই এই রীতিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত বলা ভুল।
এখন প্রশ্ন হল, নাভির উপরে হাত বাঁধা এবং নাভির নীচে হাত বাঁধা উভয়টিই কি সুন্নাত, না একটি সুন্নাত ও অপরটি মুবাহ? এই প্রশ্নের উত্তর দানের ভার ফিকহের ইমামগণের উপরই ছেড়ে দেয়া উচিত। আর তাদের অনেকেই নাভির নীচে হাত বাঁধাকে সুন্নাত বলেছেন।

৫. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়াম অবস্থায় সেজদার স্থানে দৃষ্টি আবদ্ধ রাখতেন। নামাযে এদিক সেদিক তাকাতে বারণ করতেন এবং খুশূখুযূর সাথে নামায আদায় করার আদেশ করতেন। তাঁর নামায সর্বাধিক খুশূখুযূমন্ডিত হতো

৬.  তাকবির দিয়ে হাত বাধার পর অনুচ্চস্বরে কোন দু‘আ বা সানা পড়তেন। সাধারণত ফরয নামাযে নিন্মোক্ত সানা পড়তেন-
سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا اله غيرك
সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়াবিহামদিকা ওয়াতাবারাকাসমুকা ওয়াতাআলা জাদদুকা ওয়ালা ইলাইহা গাইরুক।
এ ছাড়া আরো কিছু দু‘আও হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত তাহাজ্জুদ নামাযে পড়তেন। (ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মাআদ ১/১৯৭-১৯৯)
ফরয নামাযে উপরোক্ত সানাটি পড়া খুলাফায়ে রাশেদীনেরও আমল ছিল। (মাজদুদ্দিন ইবনে তাইমিয়া, আল মুনতাকা মিন আখবারিল মুস্তফা ১/৩৭০)

৭. সানার পরে তাআওউয ও তাসমিয়াহ পড়তেন:
তাআওউযের প্রসিদ্ধ শব্দ হল-
اعوذ بالله من الشيطان الرجيم        (আউজু বিল্লাহি মিনাশশাইতানির রাজিম)
(সহীহ বুখারী , হাদীস ৬১১৫, সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬১০, ইবনুল জাযারী , আন নাশর ফিল কিরাআতিল আশর ১/ ২৪৩)
তাআওউযের আরেকটি শব্দও সহহি হাদীসে আছে, কিন্তু সেটি তাহাজ্জুদ নামাযের ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে।
তাসমিয়াহ‘র শব্দ নির্ধারিত। আর তা হলো,                     بسم الله الرحمان الرحيم  (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম)

৮. আমরে মুতাওয়ারাস (উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা) দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আউযুবিল্লাহ অনুচ্চস্বরে পড়তেন।

৯. সহীহ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি বিসমিল্লাহ ও অনুচ্চস্বরে পড়তেন। কোন কোন বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তিনি কখনো কখনো বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়েছেন, কিন্তু এসব বর্ণনা সহীহ হওয়ার ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণের আপত্তি রয়েছে। তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়া তাঁর সুন্নাত নয়।
(ইবনে তাইমিয়া, রিসনালাতুল উলফা বাইনাল মুসলিমীন ৫০-৫১)

পরবর্তী পোস্ট:

সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-২
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৩
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৪

2 Comments

  1. Pingback: সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-২ | ইসলাম বার্তা

  2. Pingback: সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৩ | ইসলাম বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE