সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৪

পূর্বের অংশ:
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-১
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-২
সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-৩

২৬. দ্বিতীয় রাকাত প্রথম রাকাতের মতই আদায় করতেন, তবে দ্বিতীয় রাকাতের শুরুতে সানা ও তাআওউয (আউজুবিল্লাহ) পড়তেন না।

২৭. দ্বিতীয় রাকাতে দ্বিতীয় সেজদা থেকে তাকবীর বলতে বলতে তাশাহহুদের (আত্তাহিয়্যাতুর) জন্য বসতেন। এখানেও এভাবেই বসতেন ভোবে দুই সেজদার মাঝখানে বসতেন।
তাশাহহুদের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধতম বর্ণনা হল-
التحيات لله والصلوات والطيبات السلام عليك ايها النبي ورحمة الله وبركاته السلام علينا وعلى عباد الله الصالحين الشهد ان لا اله الا الله واشهد ان محمدا عبده ورسول

২৮. তিন রাকাত বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাযে তাশাহহুদের পরে কিছু পড়তেন না। তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে যেতেন।

২৯. তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে সূরা ফাতেহার সাথে অন্য কোন সূরা মিলাতেন না।

৩০. তৃতীয় (শেষ রাকাত হলে) বা চতুর্থ রাকাতে দ্বিতীয় সেজদা থেকে তাকবীর বলতে বলতে আখেরী বসতেন। আখেরী বৈঠকে বসার বিভিন্ন পদ্ধতি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু যে পদ্ধতিটিকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) নামাযের প্রত্যেক বৈঠকের জন্য মাসনূন পন্থা বলেছেন এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাযি.) যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাধারণ নিয়ম বলেছেন তা হল, বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা এবং ডান পা খাড়া করে তার অঙ্গুলিসমূহ কেবলামুখী রাখা। এ থেকে অন্যান্য আলামত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, অন্য পদ্ধতিগুলো বিশেষ অবস্থায় বা কোন উযরবশত হত। (বাদরুদ্দীন আইনী, উমদাতূ কারী ৬/১০২-১০৩, কাশ্মীরী, ফয়যুল বারী ২/৩১০-৩১২, বানুরী, মাআরেফুস সুনান ৩/১৬০-১৬৬)

৩১. তাশাহহুদের সময় উভয় হাত উরু উপর রাখতেন। ডান হাত ডান উরুর উপর এবং বামহাত বাম উরুর উপর রাখতেন। কোন কোন বর্ণনায় উভয় হাত হাঁটুর উপর রাখার কথা আছে। এর অর্থ হল হাত উপর সম্মুখভাগে এমনভাবে রাখতেন, যেন অঙ্গুলিসমূহ হাঁটু স্পর্শ করত। কোন কোন বর্ণনায় বাম হাতের পাতা বাম হাঁটুর উপর রাখার উল্লেখ এসেছে। বলাবাহুল্য এমনটি মাঝে মাঝে করে থাকবেন। (মোল্লা আলী করী, মিরকাতুল মাফাতীহ শরহু মিশকাতিল মাসাবীহ ২/ ৩২৯, শাব্বীর আহমদ উৎসমানী ফাতহুল মুলহিম শরহু সহীহি মুসলিম ২/১৬৯)
৩২. তাশাহহুদের মধ্যে ডান হাতের অঙ্গুলিসমূহ কীভাবে রাখতেন এবং কীভাবে ইশার করতেন এ ব্যাপারে সহীহ হাদীস সমূহে বিভিন্ন তরীকা বর্ণিত হয়েছে। এখানে শুধু দুইটি হাদীস উল্লেখ করা হল-
عن وائل بن حجر قال ثم جلس فافرترش رجله اليسرى ووضع يده اليسرى على فخذه اليسرى وحد مرفقيه اليمنى على فخذيه اليمنى وقبض ثنتين وحلق حلقه ورأيته يقول هكذا حلق بشر (الراوي) الابهام والوسطى واشار باسبابة
হযরত ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রাযি.) থেকে বর্ণিত তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযে বসার অবস্থা বর্ণনা করেন যে,  “তিনি তাঁর বাম পা বিছিয়ে দিলেন এবং বাম হাত বাম উরুর উপর রাখলেন। ডান কনুই ডান উরুর উপর সমান্তরালে রাখলেন। দুই অঙ্গুলি গুটালেন ও একটি গোলক বানালেন এবং আমি তাঁকে এভাবে ইশারা করতে দেখেছি, বর্ণনাকারী বিশ্র মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা গোলক তৈরী করলেন এবং শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করলেন। (সুনানে আবু দাউদ হাদীস-৯৫৭)
عن عبد الله عمر رضي الله عنه قال كان اذا جلس في الصلاة وضع كفه اليمنى على فخذه اليمنى وقبض اصابعه كلها واشار باصبعه التي تلي الابهام ووضع كفه اليسرى على فخذه اليسرى
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন, যখন তিনি নামাযে বসতেন তখন তাঁর ডান হাতের পাতা ডন উরুর উপর রাখতেন, সকল অঙ্গুলি গুটিয়ে ফেলতেন এবং বৃদ্ধাঙ্গুলির কাছের অঙ্গুলিটি দ্বারা ইশারা করতেন এবং বাম হাতের পাতা বাম উরুর উপর রাখতেন। (সহীহ মুসলিম , হাদীস-৫৮০ (১৪৪) মুহাম্মদ ইবনে হাসান শাইবানী , মুয়াত্তা ১৮৭)
এখন প্রশ্ন হয় যে, কখন হাতের অঙ্গুলি সমূহ মুঠ করা বা গোলাকার বানানো হবে বসার শুরু থেকেই না ইশারার সময়- এ ব্যাপারে স্পষ্ট কথা হাদীস শরীফে নেই। ফকীহগণ এ ব্যাপারে দুটি মত পোষণ করেন। যা সংশ্লিষ্ট আলামত ও হাদীসের ইশারা -ইঙ্গিতের উপর নির্ভরশীল।
(ক) ইশারার সময় করবে। (ইবনুল হুমাম, ফাতহুর কাদীর ১/২৭২, মোল্লা আলী কারী , মিরকাতুল মাফাতিহ২/৩২৮)
(খ) বসার শুরু থেকেই করবে। (আব্দুল হাই লাখনোভী , আসাসিআয়াহ ২/২২১)
আর ইশারা সর্বাবস্থায় কালেমা শাহাদাত পড়ার সময় হবে। এই সিদ্ধান্ত উম্মাহর কর্মধারা ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত।

ইশারার পরে হাতের অঙ্গুলি সমূহ মুষ্টিবদ্ধ অবস্থায় বা গোলাকার অবস্থায় বাকি রাখতেন কিনা? কোন কোন বর্ণনার কোন কোন শব্দ থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, ইশারার পরে সালাম পর্যন্ত এই অবস্থা বাকি থাকতো। (বানূরী মাআরিফুস সুনান ৩/১০৬)
বাম হাতের অঙ্গুলিসমূহ কীভাবে রাখতেন এ ব্যাপারে সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে যে, তা বাম উরুর উপর (সম্মুখ অংশে) বিছিয়ে রাখতেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস-৫৮০ (১১৪)
কতক ব্যক্তি মনে করেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্তাহিয়্যাতুর শুরু থেকেই শাহাদাত অঙ্গুলি নাড়ানো শুরু করতেন এবং সালাম পর্যন্ত নাড়াতে থাকতেন। এই ধারণা ভুল। এর ভিত্তি একটি দুর্বল বর্ণনা যা মুনকার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ইশারা করতেন, অঙ্গুলি নাড়াতেন না এবং তাও শুধু শাতাদাতের সময় , পুরো আত্তাহিয়্যাতু বা পুরো বৈঠকে নয়। (মাহমূদ সাঈদ মামদূহ , আততারীফ বিআওহামি মান কাসামাস সুনানা ইল সাহীহিন ওয়া যায়ীফ৪/১১-১৯, হাদীস -৩৮৫)
শাহাদাত অঙ্গুলি দ্বরা ইশারা করা প্রথম বৈঠকের তাশাহহুদের মধ্যেও মাসনূন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানেও ইশারা করতেন। (সুনানে নাসায়ী , হাদীস ১১৬১)

৩৩. আখেরী বৈঠকে তাশাহহুদের পরে দরূদ শরীফ পড়ার আদেশ করতেন। সাহাবায়ে কেরামের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদেরকে  নিন্মোক্ত দুরূদ শরীফটি শিখিয়ে দেন।
اللهم صل على محمد وعلى ال محمد كما صليت على ابراهيم وعلى ال ابراهيم انك حميد مجيد اللهم بارك على محمد وعلى ال محمد كما باركت على ابراهيم وعلى ال ابراهيم انك حميد مجيد
(সহীহ বুখারী , হাদীস৩৩৭০)
এই দুরূদকে দরূদে ইবরাহীমী বলা হয়। সহীহ হাদীসে এর বিভিন্ন শব্দ বর্ণিত হয়েছে। যে কোন শব্দ অবলম্বন করা যেতে পারে। কোন কোন বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও নামাযে এই দরূদ পড়তেন। (ইমাম শাফেয়ী , কিতাবুল উম্ম ১/১৪০, বায়হাকী সুনানে কুবর- ২/১৪৭)

৩৪. দুরূদের পর দু‘আ করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর ইরশাদ হল হামদ ও সানা অর্থাৎ তাশাহহুদ ও দরূদের পরে যে যা প্রার্থনা করতে চাও বা যে দুআ তোমাদের অধিক পছন্দ হয় তাই আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা কর। (সহী বুখারী-৩৪৭৭, সহীহ ইবনে হিব্বান- ১৯৫১)
হযরত আবু বাকর সিদ্দীক (রাযি.) এর আবেদনের প্রেক্ষিতে এই স্থলে পড়ার জন্য তাকে  নিন্মোক্ত দু‘আটি শিখিয়েছেন।
اللهم اني ظلمت نفسي ظلما كثيرا ولا يغفر الذنوب الا انت فاغفرلي مغفرة من عندك وارحمني انك انت الغفور الرحيم
(সহীহ বুখারী , হাদীস ৮৩৪)
এ ছাড়াও আরো দু‘আ বর্ণিত রয়েছে যা নিজে পড়তেন বা পড়ার নির্দেশ দিতেন। এখানে আরেকটি দ্আু উল্লেখ করা হল।
اللهم اني اعوذبك من عذاب القبر واعوذبك من فتنة المسيح الدجال واعوذبك من فتنة المحيا والممات اللهم اني اعوذبك من المأثم والمغرم
(সহীহ বুখারী , হাদীস-৮৩২)

৩৫. দু‘আর পরে উভয় দিকে সালাম ফিরাতেন। ডান দিকে ও বাম দিকে।
সালামের শব্দ হল। السلام عليكم ورحمة الله
হাযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বলেন-حذف السلام سنة
সালাম বেশি দীর্ঘ না করা সুন্নাত। (জামে তিরমিযী , হাদীস-২৯৭)
এ থেকে বোঝা যায় সালাম দীর্ঘ করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অভ্যাস ছিল না

৩৬. নামায সমাপ্ত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দু‘আ ও যিকির  নিজেও পড়তেন এবং পড়ার নির্দেশ দিতেন এবং বলতেন, রাতের শেষ প্রহরে ও ফরয নামাযের পরে দু‘আ অধিক কবূল হয়। (জামে তিরিমিযী , হাদীস -৩৪৯৯)
ফরয নামাযের পরে কখনো কখনো হাত উঠিয়ে দুআ করেছেন।
(আব্দুল ফাত্ত্হা আবু গুদ্দাহ , সালাসু রাসাইল ফি ইসতিহবাবিদ দুআয়ি বাদাস সালাওয়াতিল মাকতুবাহ, শামসুদ্দীন নূর, আততুহফাতুলমাতলুবাহ উিৎসতিহবাবি রাফয়িল য়াদাইন ফিদ দুআ বাদাল মাকতুবাহ।)

1 Comment

  1. Pingback: সহীহ দলিলের আলোকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায-২ | ইসলাম বার্তা

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Optimization WordPress Plugins & Solutions by W3 EDGE